১৯৪৬ সালের ১৬ আগষ্ট, বাংলায় হিন্দুদের অস্তিত্ব রক্ষা করেছিলেন গোপাল পাঁঠা

5769
১৯৪৬ সালের ১৬ আগষ্ট, বাংলায় ঘটে যাওয়া একটি ভয়ংকর ঘটনা/The News বাংলা
১৯৪৬ সালের ১৬ আগষ্ট, বাংলায় ঘটে যাওয়া একটি ভয়ংকর ঘটনা/The News বাংলা

১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট কলকাতায় সংঘটিত দাঙ্গা; দ্ব্যর্থহীনভাবে একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছিল। ১৬ আগষ্ট ভোর থেকেই উত্তেজনা শুরু হয়। মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে; ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্টকে “প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস” হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেয় লীগের স্বেচ্ছাসেবকেরা। উত্তর কলকাতায় হিন্দু ব্যবসায়ীদের দোকানপাট বন্ধ রাখতে বাধ্য করে; এবং হিন্দুরা এর সমুচিত প্রতিশোধ হিসেবে লীগের শোভাযাত্রাসমূহের পথে বাধার সৃষ্টি করে।

লেখক শক্তিনাথ ভট্টাচার্যের কলমে ১৬-ই আগষ্টের সঙ্গে আমাদের একটি পারিবারিক ক্ষতির ইতিহাস জড়িয়ে আছে। এই দিনটির সঙ্গে যাদের পরিচয় নেই; তারা ‘The Great Calcutta Killing / Massacre’ নামে গুগুলে সার্চ করে দেখতে পারেন।

আমাদের পরিবার থাকতেন রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ লাগোয়া অঞ্চলে। ১৬ আগস্টের আগেরদিন থেকেই; একটা চাপা উত্তেজনা টের পাওয়া গেছিল। প্রথমটায় কেউ ভাবতে পারেনি; এমন হতে পারে। পরেরদিন অর্থাৎ ১৬ই আগষ্ট সকাল থেকেই ক্রমশঃ তা এমন বীভৎস আক্রমণ ও খুনখারাপিতে পৌঁছয় যে; সন্ধ্যের মধ্যেই পাড়া খালি করে সায়েন্স কলেজে আশ্রয় নিতে হয় এবং রাত্রি বেলায় কলেজের পিছন দিক দিয়ে সবাই পালিয়ে এসে সুকিয়া ষ্ট্রীট সংলগ্ন বৃন্দাবন মল্লিক লেনে আশ্রয় নিতে হয়।

পরের দিন, পাড়ায় পাড়ায় হিন্দুদের; প্রতিরোধ বাহিনী তৈরী হয়ে যায়। কিন্তু, তখনো হিন্দুরা প্রতি আক্রমণের কথা না ভেবে; প্রশাসনের ওপরই ভরসা করেছিল। যদিও; প্রশাসন হিন্দুদের প্রতি আক্রমণে; অন্য তরফে প্রাণহানি না হওয়া পর্যন্ত নিষ্ক্রিয়ই ছিল। হিন্দুদের ওপর আক্রমণ ও হত্যার ঘটনা; বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছিল।

আরও পড়ুনঃ মেয়েদের বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স পাল্টে যাচ্ছে, লালকেল্লায় বড় ঘোষণা মোদীর

রাজাবাজার তো বটেই; মানিকতলা; রাজা দীনেন্দ্র ষ্ট্রীট; কলেজস্ট্রীট; চোরবাগান; বউবাজার এবং অন্যান্য জায়গার ভয়াবহ ঘটনা জানা যাচ্ছিল। সুকিয়া স্ট্রীট তো তার মধ্যেই পড়ে। আমার কাকা প্রনব ভট্টাচার্য অত্যন্ত সাহসী ছিলেন। পাড়ার প্রতিরোধ বাহিনীর নেতৃত্ব দেবার সময়; রাতে একদল মুসলমান দুষ্কৃতির সংঘবদ্ধ ভয়াবহ আক্রমণের পরে তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যায় নি।

পরের দিন; বউবাজারের ‘গোপাল পাঁঠা’ অর্থাৎ; শ্রী গোপাল মুখার্জী যদি সংঘবদ্ধভাবে; প্রতিআক্রমণে তাদের কচুকাটার মত অবস্থা না করতেন; তবে কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু জনসংখ্যা হয়তো আজকের বাংলাদেশের মতই হত। কাকা প্রনব ভট্টাচার্যের মৃতদেহ; নৃশংসভাবে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় পরেরদিন চোরবাগান বস্তি এলাকা থেকে উদ্ধার হয়।

তবুও, একটি কথা না বললেই নয়; সাধারণ মুসলমানদের সেই দাঙ্গায় প্ররোচিত করার পিছনে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং কিছু নেতার প্রত্যক্ষ মদত ছিল। তাদের মধ্যে কেউ আবার পরবর্তীকালে বিখ্যাত হয়েছেন এবং নিহতও হয়েছেন। কিন্তু; তার মধ্যে সামান্য হলেও কিছু মুসলমান মানুষ ছিলেন; যাঁরা এমন ঘটনা ঘটতে পারে জেনে অনেক হিন্দুকে নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে বলেছিলেন।

আমাদের সঙ্গে কর্মসূত্রে তেমন মুসলমান ব্যক্তিদের পরিচয়; বরাবর ছিল আজও আছে। সেদিন যখন পরিবারের সবাই পালিয়ে গিয়ে; অন্য জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন এবং পিতৃব্য নৃশংসভাবে খুন হলেন; তখন আমার পিতামহ আটকে পড়েছিলেন কলুটোলা স্ট্রীটে এক ব্যবসায়িক সহযোগী মুসলমান ব্যক্তির দোকানে। তিনি; তাঁকে দোকানেই লুকিয়ে রাখেন।

বাইরে তাঁরই সম্প্রদায়ের উন্মত্ত একদল দাঙ্গাবাজদের (যারা ঠাকুর্দাকে বার করে তাদের হাতে দিতে বলেছিল) প্রতিহত করেন; এবং দুদিন বাদে তাকে নিরাপদ অঞ্চলে পৌঁছে দেন। এমন মানুষ নিশ্চয় আছেন। কিন্তু; তাঁদের সংখ্যা বা ক্ষমতা এতই সীমিত; যে সমগ্র সম্প্রদায়কে বিশ্বাস বা ভরসা না-করার যথেষ্ট অবকাশ থেকে যায়। এ বিষয়ে আমাদের (বিশেষতঃ কন্যাসমা নারীদের) যথেষ্ট সচেতন হওয়ার প্রয়োজন যেমন আছেই; তেমনই এমন অবস্থার অবসান ঘটা উচিত; সেটাও কাম্য।
(লেখা ও তথ্য লেখকের ব্যক্তিগত মতামত)

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন