পুরাণ ও মহাভারত অনুযায়ী, মহালয়া সম্পর্কে সবকিছু অবশ্যই জেনে রাখুন

3935
পুরাণ ও মহাভারত অনুযায়ী, মহালয়া সম্পর্কে সবকিছু অবশ্যই জেনে রাখুন/The News বাংলা
পুরাণ ও মহাভারত অনুযায়ী, মহালয়া সম্পর্কে সবকিছু অবশ্যই জেনে রাখুন/The News বাংলা

ভোরে উঠে রেডিওতে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রর; মহালয়া শুনেছেন। তারপর, পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণও করেছেন। ‘শুভ মহালয়া’ অনেকবার শুনেছেন; সারাদিনই শুনবেন। কিন্তু মহালয়া কি এবং কেন এই মহালয়া? জানেন কি? পুরাণ ও মহাভারত অনুযায়ী; মহালয়া সম্পর্কে সবকিছু অবশ্যই জেনে রাখুন। ত্রেতা যুগে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র অকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন; লঙ্কা জয় করে সীতাকে উদ্ধারের জন্য। আসল দুর্গাপুজো হলো বসন্তে; সেটাকে বাসন্তি পুজো বলা হয়। শ্রীরামচন্দ্র অকালে, অসময়ে পুজো করেছিলেন বলে; এই শরতের পুজোকে দেবির অকাল-বোধন বলা হয়।

সনাতন ধর্মে কোন শুভ কাজ করতে গেলে; বিবাহ বা অন্যান্য আচার অনুষ্ঠান করতে গেলে; প্রয়াত পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করতে হয়। কার্যাদি-অঞ্জলি প্রদান করতে হয়। তর্পণ মানে খুশি করা। ভগবান শ্রীরাম লঙ্কা বিজয়ের আগে; এদিনে এমনই করেছিলেন। সেই অনুসারে এই মহালয়া তিথিতে; মানুষ পূর্বপুরুষদের স্মরন করে। পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনা করে; অঞ্জলি প্রদান করেন। সনাতন ধর্ম অনুসারে এই দিনে; প্রয়াত আত্মাদের মর্তে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। প্রয়াত আত্মার যে সমাবেশ হয়; তাকে মহালয় বলা হয়। মহালয় থেকে মহালয়া। পিতৃপক্ষেরও শেষদিন এটি। মাতৃপক্ষের শুরু।

আরও পড়ুনঃ করোনা আবহে মূর্তি গড়ে দুর্গাপুজো বন্ধ, শুধু ঘট পুজোর নির্দেশ অসমে

পিতৃপক্ষ পূর্বপুুরুষদের তর্পণাদির জন্য; প্রশস্ত এক বিশেষ পক্ষ। এই পক্ষ পিত্রপক্ষ; মহালয়া পক্ষ ও অপরপক্ষ নামেও পরিচিত। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, যেহেতু পিতৃপক্ষে প্রেতকর্ম (শ্রাদ্ধ), তর্পণ ইত্যাদি মৃত্যু-সংক্রান্ত আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়; সেই হেতু এই পক্ষ শুভকার্যের জন্য প্রশস্ত নয়। দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে, গণেশ উৎসবের পরবর্তী পূর্ণিমা (ভাদ্রপূর্ণিমা) তিথিতে এই পক্ষ সূচিত হয়; এবং সমাপ্ত হয় সর্বপিতৃ অমাবস্যা, মহালয়া অমাবস্যা বা মহালয়া দিবসে। উত্তর ভারত ও নেপালে ভাদ্রের পরিবর্তে; আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষকে পিতৃপক্ষ বলা হয়।

পুরাণ অনুযায়ীঃ পুরাণ অনুযায়ী, জীবিত ব্যক্তির পূর্বের তিন পুরুষ পর্যন্ত; পিতৃলোকে বাস করেন। এই লোক স্বর্গ ও মর্ত্যের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত। পিতৃলোকের শাসক মৃত্যুদেবতা যম। তিনিই সদ্যমৃত ব্যক্তির আত্মাকে; মর্ত্য থেকে পিতৃলোকে নিয়ে যান। পরবর্তী প্রজন্মের একজনের মৃত্যু হলে; পূর্ববর্তী প্রজন্মের একজন পিতৃলোক ছেড়ে স্বর্গে গমন করেন এবং পরমাত্মায় (ঈশ্বর) লীন হন। এবং এই প্রক্রিয়ায় তিনি; শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের উর্ধ্বে উঠে যান।

এই কারণে, কেবলমাত্র জীবিত ব্যক্তির পূর্ববর্তী তিন প্রজন্মেরই; শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হয়ে থাকে এবং এই শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যম; একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সূর্য কন্যারাশিতে প্রবেশ করলে; পিতৃপক্ষ সূচিত হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময় পূর্বপুরুষগণ পিতৃলোক পরিত্যাগ করে; তাঁদের উত্তরপুরুষদের গৃহে অবস্থান করেন। এরপর সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে প্রবেশ করলে; তাঁরা পুনরায় পিতৃলোকে ফিরে যান। পিতৃগণের অবস্থানের প্রথম পক্ষে; হিন্দুদের পিতৃপুরুষগণের উদ্দেশ্যে তর্পণাদি করতে হয়।

আরও পড়ুনঃ সাতজনের বেশি প্যান্ডেলে ঢুকতে পারবেন না, দুর্গাপুজোর গাইডলাইন ওড়িশা সরকারের

মহাভারত অনুযায়ী: মহাভারত অনুযায়ী, প্রসিদ্ধ দাতা কর্ণের মৃত্যু হলে; তাঁর আত্মা স্বর্গে গমন করলে; তাঁকে স্বর্ণ ও রত্ন খাদ্য হিসেবে প্রদান করা হয়। কর্ণ, ইন্দ্রকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে ইন্দ্র বলেন; কর্ণ সারাজীবন স্বর্ণই দান করেছেন; তিনি পিতৃগণের উদ্দেশ্যে কোনোদিন খাদ্য প্রদান করেননি। তাই স্বর্গে তাঁকে স্বর্ণই খাদ্য হিসেবে; প্রদান করা হয়েছে। কর্ণ বলেন, তিনি যেহেতু তাঁর পিতৃগণের সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না; তাই তিনি পিতৃগণকে খাদ্য বা অন্য কিছু প্রদান করতে পারেন নি। এই কারণে কর্ণকে ষোলো দিনের জন্য; মর্ত্যে গিয়ে পিতৃলোকের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল প্রদান করার অনুমতি দেওয়া হয়। এই পক্ষই পিতৃপক্ষ নামে পরিচিত হয়।

মহালয়া পক্ষের পনেরোটি তিথির নাম হল; প্রতিপদ, দ্বিতীয়া, তৃতীয়া, চতুর্থী, পঞ্চমী, ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, দশমী, একাদশী, দ্বাদশী, ত্রয়োদশী, চতুর্দশী ও অমাবস্যা। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি তর্পণে ইচ্ছুক হন; তাঁকে তাঁর পিতার বা কোন পূর্বপুরুষের মৃত্যুর তিথিতে তর্পণ করতে হয়।

শ্রাদ্ধানুষ্ঠান: পিতৃপক্ষে পুত্র কর্তৃক শ্রাদ্ধানুষ্ঠান; হিন্দুধর্মে অবশ্য করণীয় একটি অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানের ফলেই; মৃতের আত্মা স্বর্গে প্রবেশাধিকার পান। এই প্রসঙ্গে গরুড় পুরাণ গ্রন্থে বলা হয়েছে; “পুত্র বিনা মুক্তি নাই”। ধর্মগ্রন্থে গৃহস্থদের দেব, ভূত ও অতিথিদের সঙ্গে; পিতৃ-তর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মার্কণ্ডেয় পুরাণ গ্রন্থে বলা হয়েছে; পিতৃগণ শ্রাদ্ধে তুষ্ট হলে স্বাস্থ্য, ধন, জ্ঞান ও দীর্ঘায়ু এবং পরিশেষে উত্তরপুরুষকে; স্বর্গ ও মোক্ষ প্রদান করেন।

সর্বপিতৃ অমাবস্যা দিবসে তিথির নিয়মের বাইরে; সকল পূর্বপুরুষেরই শ্রাদ্ধ করা হয়। যাঁরা নির্দিষ্ট দিনে শ্রাদ্ধ করতে পারেন নি; তাঁরা এই দিন শ্রাদ্ধ করতে পারেন। এই দিন গয়ায় শ্রাদ্ধ করলে; তা বিশেষ ফলপ্রসূ হয়। উল্লেখ্য, গয়ায় সমগ্র পিতৃপক্ষ জুড়ে মেলা চলে। বাংলায় মহালয়ার দিন; দুর্গাপুজোর সূচনা হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিন দেবী দুর্গা; মর্ত্যলোকে আবির্ভূতা হন। মহালয়ার দিন অতি প্রত্যুষে; চণ্ডীপাঠ করার রীতি রয়েছে।

কোন কোন পরিবারে পিতৃপক্ষে; ভাগবত পুরাণ, ভগবদ্গীতা বা শ্রীশ্রীচণ্ডী পাঠ করা হয়। অনেকে পূর্বপুরুষের মঙ্গল কামনায়; ব্রাহ্মণদের দান করেন। বলা যায়, মহালয়া শুধু দুর্গাপুজোর শুরু নয়; এর ব্যাপ্তি সনাতন হিন্দু ধর্মের শুরুর সময় থেকেই।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন