ভারতের ‘জেমস বন্ড’ ৭৬ বছরের অজিত ডোভালকে কেন ছাড়তে চায় না মোদী সরকার

1536
ভারতের 'জেমস বন্ড' ৭৬ বছরের অজিত ডোভালকে কেন ছাড়তে চায় না মোদী সরকার
ভারতের 'জেমস বন্ড' ৭৬ বছরের অজিত ডোভালকে কেন ছাড়তে চায় না মোদী সরকার

ভারতের ‘জেমস বন্ড’ ৭৬ বছরের অজিত ডোভালকে; কেন ছাড়তে চায় না মোদী সরকার? দেশের প্রশাসনিক মহল অবশ্য জানে; এর উত্তরটা। দেশের নিরাপত্তা সংক্রান্ত, যে কোন সমস্যায়; সহজেই যে সমাধান করে দেন অজিত ডোভাল। দেখতে দেখতে ৭৬টি বসন্ত; পার করে দিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। ১৯৪৫ সালে বর্তমান উত্তরাখণ্ডের পাউড়ি গড়ওয়ালে; এক গড়ওয়ালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। অবসর গ্রহণের পাঁচ বছর পরে; তাঁকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করা হয়। বর্তমানে তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদীর; নিরাপত্তা উপদেষ্টা।

১৯৬৪ সালে কর্মজীবন শুরু করেন; অজিত ডোভাল। সেই বছর ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস বা আইপিএস হয়ে; কেরলে কাজ শুরু করেন তিনি। ১৯৬৬-তে থেকে মিজোরামে শুরু হয়েছিল; বি’চ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। নেতৃত্বে মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা এমএনএফ। কেরিয়ায়ের শুরুতেই গা-ঢাকা দিয়েল কাজ শুরু করেন ডোভাল। অচিরেই এমএনএফ-এর পাঁচ-ছজন নেতার; আস্থা অর্জন করে তাঁদের আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেন। ফল আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়ে।

আরও পড়ুনঃ চোখের সামনে মৃত পরিবার, প্রাণ বাঁচাতে পাকিস্তান থেকে ‘ভাগ মিলখা ভাগ’

১৯৭২-এ সোজা আইবি-তে। এর পর থেকে; একের পর এক কঠিন পরিস্থিতি ঠাণ্ডা মাথায় সামলেছেন। টানা সাত বছর পাকিস্তানে আত্মগোপন করে; খবর পাঠানোর কাজ করেছেন; পাকিস্তানের গোয়েন্দাদের চোখে ধুলো দিয়ে। পাকিস্তানের পারমাণবিক গবেষণার; গোপন তথ্য সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ডোভাল।

১৯৮৮-র মে মাস। পাঞ্জাবে চার বছর আগের, অপারেশন ব্লু-স্টারের স্মৃতি; তখনও ম্লান হয়নি। আবার স্বর্ণমন্দিরের দখল নিল; খা’লিস্তান-পন্থী সশ’স্ত্র জ’ঙ্গিরা। জ’ঙ্গিদের জন্য স্বর্ণমন্দিরের ভিতরে; আটকে গিয়েছেন পুণ্যার্থীরা। এই দলে আছেন; রোমানিয়ার কূটনীতিক লিভিউ রাড়ু। কেন্দ্রে তখন; রাজীব গাঁধীর সরকার বেশ চাপে; পঞ্জাবের পুলিশ প্রধান কেপিএস গিল। সরকারের কাছে খবর ছিল; জঙ্গির সংখ্যা ৪০ জন। জবাবে ৭০০ বিএসএফ জওয়ান; স্বর্ণমন্দির ঘিরে ফেলেছে। দিল্লি থেকে হাজির হয়েছে; ৩০০ এনএসজি কম্যান্ডো।

আরও পড়ুনঃ একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে গিয়েই জীবনের চরমতম ভুল, আক্ষেপ করেছেন সারাজীবন

জঙ্গিদের সঙ্গে কথা চললেও; কোনও ফল মিলছে না। যখন-তখন শুরু হতে পারে অভিযান; পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত। এই কয়েকদিন ধরেই, স্বর্ণমন্দিরের সামনে ঘুরঘুর করছিলেন; এক ফেরিওয়ালা। বেঁটেখাটো চেহারা; কেউই বিশেষ লক্ষ করেনি। কিন্তু এক দিন জ’ঙ্গিরা তাঁকে; ভিতরে ডেকে নিয়ে গেল। কয়েকদিন পরেই, প্রায় সবার অলক্ষ্যে; বেরিয়ে এলেন সেই ফেরিওয়ালা। না, কোনও অভিযান হল না।

মে মাসের তীব্র গরমের মধ্যে; স্রেফ বিদ্যুৎ আর জল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হল। কয়েকদিনের মধ্যেই সুরসুর করে বেরিয়ে এল জ’ঙ্গির দল; সোজা আত্মসমর্পণ। র’ক্তপাত ছাড়াই; দখলমুক্ত হল স্বর্ণমন্দির। এই ফেরিওয়ালাই এখন; ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। ফেরিওয়ালার বেশে আইএসআই-এর গু’প্তচর পরিচয় দিয়ে; জঙ্গিদের আস্থা অর্জন করেছিলেন।

আরও পড়ুনঃ নিষিদ্ধ দ্বীপের বাঙালি রানী, অসম্ভবকে সম্ভব করা বাঙালি নারী

ডোভালের চাকরি জীবনের বড় অংশ কেটেছে; কাশ্মীর সমস্যা সামলাতে। ঠিক এখন যেমন সামলাচ্ছেন। আইবি-র কাশ্মীর গ্রুপ-এর (‘কে’ গ্রুপ); নেতৃত্ব দিয়েছেন ডোভাল। এখানে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার নীতি; নিয়ে কাজ করেছেন। জ’ঙ্গি নেতাদের দলে টেনে; জ’ঙ্গি দমনের কাজ করেছেন। বর্ণময় কেরিয়ারে মিলেছে পুলিশ মেডেল; প্রেসিডেন্ট মেডেল, কীর্তিচক্র। আর এই সব নিয়ে ডোভালকে ঘিরে; তৈরি হয়েছে মিথের বলয়। এখন সংবাদমাধ্যমে ডোভালকে; ‘জেমস বন্ড’ বা ‘০০৭’ বলেও উল্লেখ করা হচ্ছে।

কাঠমাণ্ডু থেকে ছি’নতাই করা; আইসি-৮১৪-র যাত্রীদের মুক্ত করার জন্য; মাসুদ আজহারকে ছাড়তে বাধ্য হয় ভারত। বিমানে মাসুদ আজহারকে সঙ্গে নিয়ে যান; তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী যশোবন্ত সিনহা। সেই বিমানে ছিলেন ডোভালও। পাঠানকোটে বায়ুসেনা ঘাঁটিতে, জ’ঙ্গি হা’নার সময়েও; পরিস্থিতি সামলানোর দায়িত্ব ছিল ডোভালের কাঁধে।

আরও পড়ুনঃ বেমালুম উধাও হয়ে যান, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে ইঞ্জেকশন দেওয়া নার্স রাজদুলারী টিকু

আইবি থেকে অবসর নেওয়ার পরে; ২০০৯-এ বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন তৈরি করেন ডোভাল। এমনিতে নয়ডার বাড়িতে; বইয়ের পাহাড়ের মধ্যে বাস করেন ডোভাল। প্রবল ধূমপায়ী; বিশেষ লোকজন পছন্দ করেন না। তবে কোনও বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পেলে; বাড়িতে নিয়ে গিয়ে মন দিয়ে কথা শুনবেন। অনেকের মতে, ঠান্ডা মাথার জন্যই; ডোভালকে বেছে নিয়েছেন মোদী। অনেকের মতে, মোদী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার আগে থেকেই; ডোভালের পরামর্শ নিচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক থেকে অন্তর্দেশীয়; ডোভালের মত মোদীর নীতি নির্ধারণে বেশ গুরুত্ব পায়। তা ছাড়া ডোভালের কড়া ধাঁচের নীতির সঙ্গে; মোদীর ভাবনা বেশ খাপও খায়। যা নিয়ে মন্ত্রী পরিষদের অন্য সদস্যদের; আপত্তির কথাও কানাঘুষোয় শোনা যায়। ডোভালের মত মেনে, কাশ্মীর আন্দোলন কড়া হাতে দমন করা নিয়েও; মন্ত্রী পরিষদে মতভেদ রয়েছে। এরপরেও ডোভাল অবিচল। জম্মু-কাশ্মীরে নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে; সার্জিক্যাল আ’ক্রমণের পরিকল্পনার অন্যতম কাণ্ডারী ডোভাল। তবে অজিত ডোভাল-ই যে, এ যাবৎকালে দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী নিরাপত্তা উপদেষ্টা; তা নিয়ে প্রায় কারও দ্বিমত নেই।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন