বাঙালি হিন্দুর বিশ্বমানবতার ঘাটে বিসর্জনের বাজনা

923
বর্ণহিন্দুরা ব্যক্তিস্বার্থ ছাড়া জগতে আর কিছু বোঝে না/The News বাংলা
বর্ণহিন্দুরা ব্যক্তিস্বার্থ ছাড়া জগতে আর কিছু বোঝে না/The News বাংলা

বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে বর্ণহিন্দুরা ব্যক্তিস্বার্থ ছাড়া জগতে আর কিছু বোঝে না। এরা উপরে উঠলে; দুটো পয়সার মুখ দেখলে জ্যাঠতুতো, খুড়তুতো এমনকী মায়ের পেটের ভাইবোনদের‌ও চেনে না। গোষ্ঠীপ্রীতি তো দূরের কথা। বাঙালি বর্ণহিন্দু মধ্যবিত্ত দীর্ঘদিন ব্যবসা-বাণিজ্যকে খারাপ চোখে দেখে এসেছে। দুই পাতা ইংরেজি বিদ্যা শিখে; সরকারি চাকরি লাভকে মোক্ষ ভেবেছে এতকাল। বাঙালির ঘাড়ে সবার আগে ইংরেজ চেপেছিল।

তাই ইংরেজ স‌ওদাগরের আপিসে চাকরি করে; মাসান্তে দুটো টাকা নিশ্চিত মাইনে তারসঙ্গে ভাগ্য ভালো থাকলে; আর‌ও দুটো পয়সা উপরি কামাই; এই স্বল্প অথচ সহজ প্রাপ্তির লোভ থেকেই বাঙালি হিন্দুর চাকরি প্রীতি। বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকের আগে পর্যন্ত; এই প্রীতি কাটান তার পক্ষে সম্ভব হয় নি। বাঙালি বর্ণহিন্দু সবার আগে রাতের অন্ধকারে; পূর্ববঙ্গে নিজের ভিটে ছেড়েছে চোরের মতো। এমনকী নিজের প্রতিবেশী ও আত্মীয়কে পর্যন্ত না জানিয়ে।

শেষ পর্যন্ত লড়েছিল নিম্নবর্ণের বাঙালি হিন্দুরা। যদিও শেষে তারাও সংখ্যাগুরু দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রেহাই পায় নি। তবুও তারা মাটি কামড়ে আপন জমি রক্ষা করেছিল বলেই এখনও বাংলাদেশে ৮-৯ শতাংশ হিন্দু টিকে আছে। আমি নিজে জন্মসূত্রে বর্ণহিন্দু। বাঙালি হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে মতুয়াদের মধ্যে‌ই দেখছি কেবল সংঘশক্তি আছে। এবং আজকে তারা এর রাজনৈতিক ডিভিডেন্ড‌ও পাচ্ছে। সংঘশক্তি ব্যতীত কোন‌ও জনগোষ্ঠীর কপালে রাষ্ট্রের খাতির জোটে না।

নিজের জাতিগোষ্ঠীকে দেউলিয়া এবং দুর্বল বানিয়ে বিশ্বমানবতার নামে খঞ্জনি বাজানোর আরেক নাম বিনাশ। বাঙালিহিন্দুর ভেতরে; এই বিনাশবুদ্ধি বড় মারাত্মক। বলতে দ্বিধা নেই একটা দীর্ঘ সময় বামপন্থীরা; বাঙালি হিন্দুর এই বিনাশবুদ্ধির গোড়ায় ধূপধুনো দিয়েছে। উদারবাদ ততক্ষণই উত্তম যতক্ষণ আমার জন্য উত্তম। কিন্তু যখন উদারবাদ আপন সর্বনাশের কারণ; তখন তার মতো অধম জিনিস আর নেই।

আরও পড়ুনঃ হিন্দু হওয়ায় দানিশ কানেরিয়াকে দলে হেনস্থা হতে হত

এটা পৃথিবীর সব জাতি বোঝে একমাত্র ব্যতিক্রম বিশ্বমানবিক বাঙালি। পূর্ব পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে বাঙালিহিন্দুর দুর্দশা দেখে; পশ্চিমবঙ্গের বিশ্বমানবতাবাদী, উদার প্রগতিশীলরা কখনও দু ফোঁটা চোখের জল খরচ করেন নি; পাছে তাদের বিশ্বমানবতার পবিত্র আলখাল্লাটিতে সঙ্কীর্ণতার কাদা লাগে; এই ভয়ে। অথচ গত তিরিশ বছরে বাংলাদেশের বাঙালিহিন্দুদের জন্য পশ্চিমবঙ্গের উদারবাদী বাঙালিও দু ছটাক উৎকণ্ঠা প্রকাশের অনেক সুযোগ পেয়েছিল।

আরও পড়ুনঃ হিন্দুরা অত্যাচারিত, পাকিস্তানের সংখ্যালঘু দরদী মুখোশ খুলে গেল

তবে সময় বড় নির্মম এবং বেশ খেয়ালিও বটে। এখন দুনিয়া জুড়ে বিশ্বপ্রেমের বদলে গোষ্ঠীপ্রেমের জোয়ার উঠেছে। এই জোয়ারে ভুবনবাদী বাঙালিহিন্দুও; ইদানিং বিশ্বভুবনের হিত ভুলে বেসুরো গাইছে। পশ্চিমবঙ্গে বসে যারা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের অন্ধ বিরোধিতা করছেন; তারা দেওয়ালের লিখন পড়তে পারছেন না। তবে শীঘ্রই পড়তে পারবেন। এই আইনের ভেতর মোদী -শাহের সূক্ষ্ম রাজনীতি নেই; এটা বলার মতো মূর্খ আমি ন‌ই।

কিন্তু এই আইন যে বাঙালিরহিন্দু উদ্বাস্তুদের প্রতি ভারত সরকারের একটি স্বীকৃতি এটা অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই। ১৯৪৭এর পর; এই উপমহাদেশে বাঙালিহিন্দু উদ্বাস্তুদের মতো হতভাগা এবং বঞ্চিত জনগোষ্ঠী আর দ্বিতীয়টি নেই। বাঙালিহিন্দুর মনের নাউ সহসা আর বিশ্বমানবতার ঘাটে ভিড়ছে না।

লেখক: উত্তম কুমার দেব (লেথা ও মতামত লেখকের নিজস্ব)

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন