নিষিদ্ধ দ্বীপের বাঙালি রানী, অসম্ভবকে সম্ভব করা বাঙালি নারী

18996
নিষিদ্ধ দ্বীপের বাঙালি রানী, অসম্ভবকে সম্ভব করা বাঙালি নারী
নিষিদ্ধ দ্বীপের বাঙালি রানী, অসম্ভবকে সম্ভব করা বাঙালি নারী

নিষিদ্ধ দ্বীপের বাঙালি রানী; অসম্ভবকে সম্ভব করা এক বাঙালি নারী। আন্দামানের জারোয়াদের প্রথম বাঙালি বন্ধু; মধুমালা চট্টোপাধ্যায় এর ঘটনা; আজও চমকে দেয় বাংলা ও ভারতের মানুষকে। ১৯৯১ সালে ৩ জানুয়ারি, Anthropological Survey of India-এর তখনকার গবেষক; মধুমালা পা রাখেন সেন্টিনেল দ্বীপে। জারোয়া বা সেন্টিনেলিজ-দের তীরের প্রাথমিক আক্রমণ থেকে, নিজেকে বাঁচিয়ে; তারপর তাদের সঙ্গে সফলভাবে বন্ধুত্ব করতে পেরেছিলেন তিনি। সেই প্রথমবার কেউ পা দিলেন; নিষিদ্ধ জারোয়া দ্বীপে।

৩০ বছর আগেকার ঘটনা শুনলে; আজও মানুষের গায়ে কাঁটা দেয়। দিনটা ছিল; ১৯৯১ সালের ৩ জানুয়ারি। রাতে এম ভি তারমুগলি জাহাজে করে; নর্থ সেন্টিনেল দ্বীপের উদ্দেশে রওনা দেন; আন্দামান ও নিকোবর প্রশাসনের উপজাতি কল্যাণ বিভাগের অধিকর্তা এস আওয়ারাদি; ডাক্তার অরুণ মল্লিক; সাধারণ পোশাকে দশ নিরাপত্তারক্ষী এবং মধুমালা চট্টোপাধ্যায়। পর দিন সকাল আটটা নাগাদ, প্রচুর নারকেল নিয়ে একটি সরকারি নৌকায় চেপে; তাড়া এগিয়ে যান দ্বীপের দিকে। প্রথমে চোখে পড়ে; কয়েকটি কুঁড়েঘর।

আরও পড়ুনঃ গরিব ছিলেন পাননি প্রেমিকা-কে, মুখ্যমন্ত্রী হয়ে অমর করে রাখলেন ভালোবাসাকে

সমুদ্রতীরে দেখা গেল; অল্প কিছু সেন্টিনেলিকে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের হাতে; তীর-ধনুক। জাহাজ দ্বীপের যত কাছে যেতে লাগল; তাঁদের কিছুটা ভয়-ভয় করতে লাগল! কারণ তাঁরা জানতেন; যে কোন মুহূর্তে ছুটে আসবে তীর। তবে, মধুমালা একটুও না ঘাবড়ে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া একটা একটা করে নারকেল; গড়িয়ে দিতে থাকলেন সেন্টিনেলিদের দিকে। অন্যদিকে তারাও আহ্লাদের সঙ্গে; সেগুলো কুড়িয়ে নিতে থাকে।

১৯৮৯ সালে আন্দামান এসে, ‘ওঙ্গে’ উপজাতিদের নিয়ে; কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল মধুমালার। তাদের ভাষাও কিছুটা রপ্ত করেছিলেন; এমনকি কিছু সাংকেতিক শব্দ বা ইঙ্গিত তিনি বুঝতে পারতেন। তার উপরে ভরসা করে মধুমালা যখন, সেন্টিনেলিদের উদ্দেশ্যে বললেন; ‘কাইরি ইচেইরা’, মানে দাঁড়ায় ‘আমি তোমাদের মায়ের মতো; এ দিকে এসো’। তার উত্তরে কয়েকজন সাড়াও দেয়! ‘নারিয়ালি জাবা, জাবা’; মানে আরও নারকেল পাঠাও। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ততক্ষণে; নারকেলের ভাণ্ডার প্রায় শেষ।

আরও পড়ুনঃ বেমালুম উধাও হয়ে যান, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে ইঞ্জেকশন দেওয়া নার্স রাজদুলারী টিকু

ওই দিনই দুপুর দুটো নাগাদ চটের বস্তায় করে; প্রচুর নারকেল নিয়ে আবার আসা হল মধুমালার নেতৃত্বে। এইবার তাঁরা আরো একটু সাহস সঞ্চয় করে; আরও কাছাকাছি গেলেন। নারকেল বিতরণের সময়; অনেক সেন্টিনেলিরা এসে নিল। কিন্তু এল না শুধু একজন। আঠারো-উনিশ বছরের এক তরুণ দূর থেকে; মধুমালাকে লক্ষ্য করছিল! হঠাৎ সে মধুমালার উদ্দেশ্যে, তীর নিশানা করতেই; তাকে ধাক্কা দেয় এক সেন্টিলেনি মহিলা।

তাদের নিশানা অব্যর্থ! কিন্তু ধাক্কার ফলে সেই বিষ মাখানো তীর; জলে পড়ে যায়! ভাগ্যিস, সেই মহিলা সেদিন; তাঁর ত্রাতা হয়েছিলেন নাহলে…..। এই ঘটনায় একটু হকচকিয়ে গেলেও, এই প্রথমবার সফল হল; এই নিষিদ্ধ দ্বীপে ‘গিফ্ট ড্রপিং’ অভিযান। মধুমালার মতে, হয়তো সরকারি দলে এক মহিলার উপস্থিতি; ওই উপজাতিদের বিশ্বাস অর্জনে সক্ষম হয়েছিল।

আরও পড়ুনঃ আরব হানাদার-দের দমন করেও, ভারতের ‘ধর্মনিরপেক্ষ ইতিহাসে’ জায়গা পাননি, রাজা বাপ্পাদিত্য রাওয়াল

১৯৯১ সালের আগেও ১৯৭৬ সালে, বিশিষ্ট নৃতত্ত্ববিদ টি এন পণ্ডিতের নেতৃত্বে; একটি দল ওই দ্বীপে যায়, কিন্তু সেই অভিযান সফল হয়নি। তবে ১৯৯৬ সালে টি এন পণ্ডিতের নেতৃত্বে আবার; ওই দ্বীপে অভিযান হয়েছিল। এবার সঙ্গে ছিলেন; মধুমালা চট্টোপাধ্যায়। যাতে তাঁকে সহজে চিনতে পারে তাই; আগেরবারের মতোই তিনি পরেছিলেন নীল চুড়িদার ও সাদা ওড়না। এ বার নারকেল নিতে, সেন্টিনেলিরা সরাসরি; নৌকাতেই উঠে আসে।

মধুমালার সৌভাগ্য যে তিনি; এই দ্বীপপুঞ্জের ছটি উপজাতি; ‘গ্রেট আন্দামানিজ’; ‘ওঙ্গে’; ‘জারোয়া’; ‘সেন্টিনেলি’; ‘শম্পেন’ এবং ‘নিকোবরিজ’; প্রত্যেককে নিয়ে কম-বেশি কাজ করেছেন। এর জন্য সফর করেছেন; প্রত্যেকটি উপজাতির মূল আবাসস্থলে। লিটল আন্দামান থেকে মিডল আন্দামান; গ্রেট নিকোবর থেকে কার নিকোবর সর্বত্র; তাঁর পদচিহ্ন রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ বাঙালি বিজ্ঞানী, ইংরেজ আমলে পাননি নোবেল, স্বাধীন ভারতে সম্মান জোটেনি বাংলায়

সেখানে তিনি পরিচিত; ‘জংলি ম্যাডাম’ এই নামে। তিনি এই বিষয়ে প্রকাশ করেছেন; তাঁর কুড়িটি গবেষণাপত্র। তাঁর লেখা বই ‘ট্রাইবজ অফ কার নিকোবর’; স্থান পেয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়াম, অক্সফোর্ড ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে। জারোয়াদের দ্বীপে এক জারোয়া মায়ের অনুমতি নিয়ে; তিনমাসের এক শিশুকে তিনি প্রথম কোলেও নেন। তারপর থেকেই; জরোয়াদের বন্ধু হয়ে যান মধুবালা।

ছবছরের গবেষণার শেষে মধুমালা লেখেন; “ওই আদিবাসী মানুষগুলো হয়তো প্রযুক্তির দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে; কিন্তু সামাজিকভাবে তারা আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে”। আন্দামান নিকোবরের অন্তর্গত এই দ্বীপটির মালিকানা; কাগজ কলমে ভারতের হাতে। কিন্তু কারোর সঙ্গে; সম্পর্ক রাখতে চায় না এখানকার বাসিন্দারা।

আরও পড়ুনঃ বিশ্বে প্রথম মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন এক বাঙালি নারী

তারা বস্ত্র হিসেবে এখনো গাছের পাতা বা বাকল; অথবা পশুর চামড়া ব্যবহার করে। খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে; বনের ফলমূল ও শিকার করা পশুর মাংস। তারা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে এখনও; বিভিন্ন সাংকেতিক শব্দ ব্যাবহার করে। অর্থাৎ তাদের কোন; কথিত ভাষা নেই। তারা সংখ্যায় কতজন; সেই বিষয় নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কয়েক বছর আগে, আন্দামানের এই সেন্টিনেলিজ়-দের তীরের আক্রমণে; মার্কিন যুবক জন অ্যালেন চাউয়ের মৃত্যুর খবরে; গোটা বিশ্বে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল।

অনেকেই বলেন, সেন্টিনেলিজ়দের তাদের মতো; ছেড়ে দেওয়াই উচিত। আবার কারও-কারও মতে; তারা ‘হিংস্র’, তাই তাদের ‘সভ্য’ করার দায়িত্ব আমাদের! তারা হয়তো অনেকেই জানেন না যে; অ্যালেন চাউয়ের বহু বছর আগেই এই ‘সভ্য’ জগতের একজন; সফলভাবে বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেলেছিলেন সেন্টিনেলিজ় এবং জারোয়াদের সঙ্গে। তিনি এক বাঙালি কন্যা; মধুমালা চট্টোপাধ্যায়। নিষিদ্ধ দ্বীপের বাঙালি রানী।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন