আপনি বাঙালি হলে, মহালয়া দেবীপক্ষ পিতৃপক্ষ তর্পণ কি ভালো করে জেনে রাখুন

535
আজ মহালয়া দেবীপক্ষের শুরু, বাঙালিদের মহালয়া কি ও কেন জানা খুব দরকার/The News বাংলা
আজ মহালয়া দেবীপক্ষের শুরু, বাঙালিদের মহালয়া কি ও কেন জানা খুব দরকার/The News বাংলা

ভোরে উঠে রেডিওতে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রর মহালয়া শুনেছেন। তারপর, পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণও করেছেন। ‘শুভ মহালয়া’ আজ অনেকবার শুনেছেন; সারাদিনই শুনবেন। কিন্তু মহালয়া কি এবং কেন এই মহালয়া? জানেন কি? আজ মহালয়া দেবীপক্ষের শুরু। আপনি বাঙালি হলে; মহালয়া দেবীপক্ষ পিতৃপক্ষ তর্পণ কি ও কেন; ভালো করে জেনে রাখুন। ত্রেতা যুগে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র অকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন; লঙ্কা জয় করে সীতাকে উদ্ধারের জন্য। আসল দুর্গাপুজো হলো বসন্তে; সেটাকে বাসন্তি পুজো বলা হয়। শ্রীরামচন্দ্র অকালে; অসময়ে পুজো করেছিলেন বলে এই শরতের পুজোকে; দেবির অকাল-বোধন বলা হয়।

সনাতন ধর্মে কোন শুভ কাজ করতে গেলে; বিবাহ বা অন্যান্য আচার অনুষ্ঠান করতে গেলে; প্রয়াত পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করতে হয়; কার্যাদি-অঞ্জলি প্রদান করতে হয়। তর্পণ মানে খুশি করা। ভগবান শ্রীরাম লঙ্কা বিজয়ের আগে এদিনে এমনই করেছিলেন।

আরও পড়ুনঃ মহালয়ার আগে পিতৃপক্ষেই দুর্গা পুজো উদ্বোধন, বিতর্ক এড়াতে কি করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা

সেই অনুসারে এই মহালয়া তিথিতে মানুষ পূর্বপুরুষদের স্মরন করে; পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনা করে অঞ্জলি প্রদান করেন। সনাতন ধর্ম অনুসারে এই দিনে প্রয়াত আত্মাদের মর্তে পাঠিয়ে দেওয়া হয়; প্রয়াত আত্মার যে সমাবেশ হয় তাকে মহালয় বলা হয়। মহালয় থেকে মহালয়া। পিতৃপক্ষেরও শেষদিন এটি। মাতৃপক্ষের শুরু।

পিতৃপক্ষ পূর্বপুুরুষদের তর্পণাদির জন্য প্রশস্ত এক বিশেষ পক্ষ। এই পক্ষ পিতৃপক্ষ; মহালয়া পক্ষ ও অপরপক্ষ নামেও পরিচিত। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী; যেহেতু পিতৃপক্ষে প্রেতকর্ম (শ্রাদ্ধ); তর্পণ ইত্যাদি মৃত্যু-সংক্রান্ত আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়; সেই হেতু এই পক্ষ শুভকার্যের জন্য প্রশস্ত নয়।

Image Source: Google Image

দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে গণেশ উৎসবের পরবর্তী পূর্ণিমা (ভাদ্রপূর্ণিমা) তিথিতে; এই পক্ষ সূচিত হয় এবং সমাপ্ত হয় সর্বপিতৃ অমাবস্যা; মহালয়া অমাবস্যা বা মহালয়া দিবসে। উত্তর ভারত ও নেপালে ভাদ্রের পরিবর্তে; আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষকে পিতৃপক্ষ বলা হয়।

পুরাণ অনুযায়ী : পুরাণ অনুযায়ী; জীবিত ব্যক্তির পূর্বের তিন পুরুষ পর্যন্ত পিতৃলোকে বাস করেন। এই লোক স্বর্গ ও মর্ত্যের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত। পিতৃলোকের শাসক মৃত্যুদেবতা যম। তিনিই সদ্যমৃত ব্যক্তির আত্মাকে মর্ত্য থেকে পিতৃলোকে নিয়ে যান। পরবর্তী প্রজন্মের একজনের মৃত্যু হলে; পূর্ববর্তী প্রজন্মের একজন পিতৃলোক ছেড়ে স্বর্গে গমন করেন; এবং পরমাত্মায় (ঈশ্বর) লীন হন এবং এই প্রক্রিয়ায় তিনি শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের উর্ধ্বে উঠে যান।

এই কারণে, কেবলমাত্র জীবিত ব্যক্তির পূর্ববর্তী তিন প্রজন্মেরই শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হয়ে থাকে; এবং এই শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সূর্য কন্যারাশিতে প্রবেশ করলে পিতৃপক্ষ সূচিত হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময় পূর্বপুরুষগণ পিতৃলোক পরিত্যাগ করে; তাঁদের উত্তরপুরুষদের গৃহে অবস্থান করেন। এরপর সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে প্রবেশ করলে; তাঁরা পুনরায় পিতৃলোকে ফিরে যান। পিতৃগণের অবস্থানের প্রথম পক্ষে; হিন্দুদের পিতৃপুরুষগণের উদ্দেশ্যে তর্পণাদি করতে হয়।

মহাভারত অনুযায়ী: মহাভারত অনুযায়ী, প্রসিদ্ধ দাতা কর্ণের মৃত্যু হলে তাঁর আত্মা স্বর্গে গমন করলে; তাঁকে স্বর্ণ ও রত্ন খাদ্য হিসেবে প্রদান করা হয়। কর্ণ, ইন্দ্রকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে ইন্দ্র বলেন; কর্ণ সারাজীবন স্বর্ণই দান করেছেন; তিনি পিতৃগণের উদ্দেশ্যে কোনোদিন খাদ্য প্রদান করেননি। তাই স্বর্গে তাঁকে স্বর্ণই খাদ্য হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। কর্ণ বলেন, তিনি যেহেতু তাঁর পিতৃগণের সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না; তাই তিনি পিতৃগণকে খাদ্য বা অন্য কিছু প্রদান করতে পারেন নি। এই কারণে কর্ণকে ষোলো দিনের জন্য মর্ত্যে গিয়ে; পিতৃলোকের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল প্রদান করার অনুমতি দেওয়া হয়। এই পক্ষই পিতৃপক্ষ নামে পরিচিত হয়। কোন কোন বইয়ে এই কাহিনিতে ইন্দ্রের বদলে যমকে দেখা যায়।

মহালয়া পক্ষের পনেরোটি তিথির নাম হল প্রতিপদ; দ্বিতীয়া; তৃতীয়া; চতুর্থী; পঞ্চমী; ষষ্ঠী; সপ্তমী; অষ্টমী; নবমী; দশমী; একাদশী; দ্বাদশী; ত্রয়োদশী; চতুর্দশী ও অমাবস্যা। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি তর্পণে ইচ্ছুক হন; তাঁকে তাঁর পিতার বা কোন পূর্বপুরুষের মৃত্যুর তিথিতে তর্পণ করতে হয়।

শ্রাদ্ধানুষ্ঠান: পিতৃপক্ষে পুত্র কর্তৃক শ্রাদ্ধানুষ্ঠান; হিন্দুধর্মে অবশ্য করণীয় একটি অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানের ফলেই; মৃতের আত্মা স্বর্গে প্রবেশাধিকার পান। এই প্রসঙ্গে গরুড় পুরাণ গ্রন্থে বলা হয়েছে; “পুত্র বিনা মুক্তি নাই”। ধর্মগ্রন্থে গৃহস্থদের দেব; ভূত ও অতিথিদের সঙ্গে পিতৃ-তর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মার্কণ্ডেয় পুরাণ গ্রন্থে বলা হয়েছে; পিতৃগণ শ্রাদ্ধে তুষ্ট হলে স্বাস্থ্য; ধন; জ্ঞান ও দীর্ঘায়ু এবং পরিশেষে উত্তরপুরুষকে স্বর্গ ও মোক্ষ প্রদান করেন।

বাৎসরিক শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যাঁরা অপারগ; তাঁরা সর্বপিতৃ অমাবস্যা পালন করে পিতৃদায় থেকে মুক্ত হতে পারেন। পুরাণ মতে, শ্রাদ্ধ বংশের প্রধান ধর্মানুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে পূর্ববর্তী তিন পুরুষের উদ্দেশ্যে পিণ্ড ও জল প্রদান করা হয়; তাঁদের নাম উচ্চারণ করা হয় এবং গোত্রের পিতাকে স্মরণ করা হয়। এই কারণে একজন ব্যক্তির পক্ষে; বংশের ছয় প্রজন্মের নাম স্মরণ রাখা সম্ভব হয় এবং এর ফলে বংশের বন্ধন দৃঢ় হয়।

জীবিত ব্যক্তির পিতা বা পিতামহ যে তিথিতে মারা যান; পিতৃপক্ষের সেই তিথিতে তাঁর শ্রাদ্ধানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। তবে এই নিয়মের কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছে। পূর্ববর্তী বছরে মৃত ব্যক্তির শ্রাদ্ধ হয় চতুর্থী (চৌথা ভরণী) বা পঞ্চমী (ভরণী পঞ্চমী) তিথিতে।

সধবা নারীর মৃত্যু হলে; তাঁর শ্রাদ্ধ হয় নবমী (অবিধবা নবমী) তিথিতে। বিপত্নীক ব্যক্তি, ব্রাহ্মণী নারীদের শ্রাদ্ধে নিমন্ত্রণ করেন। শিশু বা সন্ন্যাসীর শ্রাদ্ধ হয় চতুর্দশী (ঘট চতুর্দশী) তিথিতে। অস্ত্রাঘাতে বা অপঘাতে মৃত ব্যক্তিদেরও; শ্রাদ্ধ হয় এই তিথিতেই (ঘায়েল চতুর্দশী)।

সর্বপিতৃ অমাবস্যা দিবসে তিথির নিয়মের বাইরে; সকল পূর্বপুরুষেরই শ্রাদ্ধ করা হয়। যাঁরা নির্দিষ্ট দিনে শ্রাদ্ধ করতে ভুলে যান; তাঁরা এই দিন শ্রাদ্ধ করতে পারেন। এই দিন গয়ায় শ্রাদ্ধ করলে; তা বিশেষ ফলপ্রসূ হয়। উল্লেখ্য, গয়ায় সমগ্র পিতৃপক্ষ জুড়ে মেলা চলে।

বাংলায় মহালয়ার দিন দুর্গাপুজোর সূচনা হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী; এই দিন দেবী দুর্গা মর্ত্যলোকে আবির্ভূতা হন। মহালয়ার দিন অতি প্রত্যুষে চণ্ডীপাঠ করার রীতি রয়েছে। আশ্বিন শুক্লা প্রতিপদ তিথিতে; দৌহিত্র মাতামহের তর্পণ করেন। মহালয়ার দিন পিতৃপুরুষের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়; দ্বিপ্রহরে নদী বা পুকুর তীরে বা শ্রাদ্ধকর্তার গৃহে।

শ্রাদ্ধকর্তাকে স্নান করে শুদ্ধ হয়ে ধুতি পরে শ্রাদ্ধ করতে হয়। শ্রাদ্ধের পূর্বে তিনি কুশাঙ্গুরীয় (কুশ ঘাসের আঙটি) ধারণ করেন। এরপর সেই আঙটিতে পূর্বপুরুষদের আবাহন করা হয়। শ্রাদ্ধ খালি গায়ে করতে হয়; কারণ শ্রাদ্ধ চলাকালীন যজ্ঞোপবীতের অবস্থান বারংবার পরিবর্তন করতে হয়। শ্রাদ্ধের সময় সিদ্ধ অন্ন ও ময়দা ঘি ও তিল দিয়ে মাখিয়ে; পিণ্ডের আকারে উৎসর্গ করা হয়। একে পিণ্ডদান বলে। এরপর দুর্বাঘাস; শালগ্রাম শিলা বা স্বর্ণমূর্তিতে বিষ্ণু এবং যমের পূজা করা হয়। এরপর পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে খাদ্য প্রদান করা হয়। এই খাদ্য সাধারণত ছাদে রেখে আসা হয়।

কোনো কোনো পরিবারে পিতৃপক্ষে ভাগবত পুরাণ; ভগবদ্গীতা বা শ্রীশ্রীচণ্ডী পাঠ করা হয়। অনেকে পূর্বপুরুষের মঙ্গল কামনায় ব্রাহ্মণদের দান করেন। বলা যায়, মহালয়া শুধু দুর্গাপুজোর শুরু নয়। এর ব্যাপ্তি সনাতন হিন্দু ধর্মের শুরুর সময় থেকেই।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন