ব্রিটিশ, রুশ ও মার্কিন, পৃথিবীর সেরা তিন সামরিক শক্তি জিততে পারেনি কাবুলিওয়ালার দেশে

463
ব্রিটিশ, রুশ ও মার্কিন, পৃথিবীর সেরা তিন সামরিক শক্তি জিততে পারেনি কাবুলিওয়ালার দেশে
ব্রিটিশ, রুশ ও মার্কিন, পৃথিবীর সেরা তিন সামরিক শক্তি জিততে পারেনি কাবুলিওয়ালার দেশে

ব্রিটিশ, রুশ ও মার্কিন, পৃথিবীর সেরা তিন সামরিক শক্তি; জিততে পারেনি কাবুলিওয়ালার দেশে। আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে আফগানিস্তান হল; ‘The Graveyard of Empires’। যুগে যুগে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর কাছে, কখনোই অত সোজা ছিল না; এই ৫৬ ইঞ্চি ছাতির দুর্ধর্ষ কাবুলিওয়ালাগুলোর কোমরে দড়ি পরানো। উনিশ শতকে ব্রিটিশরা অনেক লড়েও হার মেনেছে; বিংশ শতকে সোভিয়েত নাক কাটিয়েছে; আর হালে পিছু হঠলো মহা শক্তিধর আমেরিকা। বিদেশি শক্তির কাছে কখনই; মাথা নত করেনি আফগানিস্তানের আফগানরা।

পৃথিবীর ম্যাপ অনুযায়ী, আফগানিস্তানের উপরে ছিল সোভিয়েত সাম্রাজ্য; নীচে ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। দুজনেই দুজনকে সন্দেহের চোখে দেখত যে; আফগানিস্তানের উপর নজর নেই তো ! সেই সময় আফগানিস্তানের রাজা ছিল এমির দোস্ত মহম্মদ; ব্রিটিশরা খুব সহজেই তাকে হটিয়ে; নিজেদের পোষা রাজা শাহ সুজাকে বসিয়ে দেয়। আফগানিস্তানে তো আর তখন কোন আর্মি ছিল না; ছোট ছোট গ্রামের মোড়লরা গ্রামের ছেলেদের নিয়ে; এমির দোস্তের নামে লড়াই করে টাকা পেত।

কিন্তু এমির শাহ সুজার আন্ডারে সেই টাকা একদমই কমে যায়; তাই সব মোড়ল মিলে এককাট্টা হয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে দেয়। প্রথম অ্যাংলো আফগান যুদ্ধ; ৩ বছর ব্যাপী এই যুদ্ধে ব্রিটিশরা হেরে যায়; এবং আফগান মোড়লরা শাহ সুজা-কে কোতল করে এমির দোস্তকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে। কিন্তু কয়েকবছর পরে আবার ব্রিটিশরা যুদ্ধের ডাক দেয়, দ্বিতীয় অ্যাংলো আফগান যুদ্ধে এবার জিতেও যায়। কিন্ত যুদ্ধে জিতেও ব্রিটিশদের কখনোই টার্গেট ছিল না পূর্ণ রাজত্ব করা; শুধুমাত্র রাশিয়ার সঙ্গে থাকা বর্ডার এলাকাগুলো দখল করেই তারা খুশি ছিল।

সাল ১৮৯৩
ব্রিটিশরা আফগানিস্তান আর ব্রিটিশ ভারতের মাঝে; একটা বর্ডার লাইন বানায়। যা আজও পাকিস্তান আফগানিস্তান বর্ডার হিসেবে কায়েম আছে; যা ডুরান্ড লাইন হিসাবেই পরিচিত। রাশিয়াও মেনে নেয় যে, আফগানিস্তান ব্রিটিশদের শাসনেই থাকবে; ওরা আর ওদিকে নজর দেবে না।

সাল ১৯১৯
তৃতীয় অ্যাংলো আফগান যুদ্ধে; যেটা আফগানদের স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে পরিচিত; আফগানরা এই যুদ্ধে ব্রিটিশদের পুরোপুরি বিধ্বস্ত করে দেয়। যদিও অনেকে বলে, ব্রিটিশরা ইচ্ছে করেই এই লড়াই হেরে যায়; ডুরান্ড লাইনকে পাকাপাকি-ভাবে কায়েম করার জন্য।

সাল ১৯২৬
একজন লিবারেল আর প্রোগ্রেসিভ রাজা পায় আফগানিস্তান; রাজা আমানুল্লা খান। তিনি প্রথম পলিগ্যামির ট্র্যাডিশন ভেঙে, একটা মাত্র বিয়ে করেন; তাঁর প্রাণপ্রিয় প্রেমিকা সোরায়া কে। তারপর দুজন মিলে অনেক মধ্যযুগীয় বিধিনিষেধ; তুলে দেন দেশ থেকে। পলিগ্যামি ব্যান করা হয়; নারীপুরুষ সমানাধিকার কায়েম হয়; মেয়েদের জন্য স্কুল বানানো হয়; এমনকি মেয়েদের ডিভোর্স দেওয়ার অধিকারও দেওয়া হয়। একটা জনসভায় রানী সোরায়া; নিজের হিজাব ছিঁড়ে ফেললেন।

স্বাভাবিকভাবেই এতে যা হওয়ার তাই হল; একদল ইসলামের রক্ষাকর্তা চিৎকার করে উঠল; “ইসলাম খতরে মে হে”; এবং পরপর তিনবার গৃহযুদ্ধর আগুনে ছারখার হয়ে যায়; মুক্তমনা রাজার স্বপ্নের আফগানিস্তান। সেই আগুনের তাপে রাজা-রানী; শেষমেষ পালিয়ে আসেন ভারতে। পরবর্তীকালে তাঁদের মেয়ের নাম রাখেন প্রিন্সেস ইন্ডিয়া; এখনো বেঁচে আছেন ৯২ বছর বয়সে।

সাল ১৯৪৭
ভারতবর্ষ স্বাধীন হল। ডুরান্ড লাইন নিয়ে কিন্তু আফগানিস্তান, মোটেই খুশি হয় না; কারণ তাদের পাশতুন উপজাতির একটা বড় অংশ পাকিস্তানের খাইবার পাখতুন এলাকায় থেকে যায়; সেই এলাকা আফগানদের চাই-ই চাই। সেই কারণে আফগানরা পাকিস্তানের ভিতর ছোট ছোট অন্তরদ্বন্দ্বে মদত দিতে থাকে; ফলে পাকিস্তান তাদের বর্ডার বন্ধ করে দেয় এবং দুই দেশের ট্রেড রিলেশন শেষ হয়ে যায়; এবং সম্পর্কও খারাপ হয়ে যায়।

সাল ১৯৬৪
শিক্ষিত আফগান সমাজে কমিউনিস্ট আদর্শ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে; এবং সমাজ মোটামুটি দুই দলে ভাগ হয়ে যায়। ইসলামিক আফগান; ও কমিউনিস্ট আফগান। ১৯৬৪ সালে কূটনৈতিক-ভাবে; দাউদ খানকে হারিয়ে রাজা হয় জাহির শাহ। কিন্তু জনপ্রিয় দাউদ খান; ভিতরে ভিতরে প্রস্তুত হচ্ছিল। এবং ১৯৭৩ সাল নাগাদ জাহির মিঞা বিদেশ ভ্রমণে গেলে; দেশের আর্মি, কমিউনিস্ট পার্টি আর ইসলামিক পার্টির বিরাট সমর্থনে গদি দখল করেন দাউদ ভাইজান। নিজেকে রাজা ঘোষণা করার বদলে; প্রেসিডেন্ট বলে ঘোষণা করেন। আফগানিস্তান-কে রিপাবলিক দেশ; বলে ঘোষণা করে দেন তিনি।

আপাতভাবে ভালো লাগলেও, দাউদ খান আসলে দেশ জুড়ে; ডিক্টেটরশিপ চালু করে দেয় এবং জাহির মিঞা আর দেশে ফেরার সাহস পায় না; ইতালি পালিয়ে যায়। ডিক্টেটর হওয়া সত্বেও দাউদ খান তার দেশকে ভালোবাসত; অনেক সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন করে সেই সময়; মানুষ মন থেকে ‘সত্যিই স্বাধীন’ ছিল। এমনকি ১৯৬০-৭০ সালে আফগান সুন্দরীরা; মিনিস্কার্ট পরে ঘুরতে পারত আফগানিস্তানে। এমনকি আফগানদের মধ্যে, হিপি কালচারও; ব্যাপক প্রসার পেয়েছিল। খুবই শান্তিপূর্ণ এবং লোভনীয় ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে; সুনামও অর্জন করেছিল সেই সময়ের আফগানিস্তান।

আরও পড়ুনঃ ২০ বছর পর ‘স্বাধীন’ আফগানিস্তান, গুলি ও রকেট ছুঁড়ে স্বাধীনতা পালন তালিবানের

সময়; ঠান্ডা লড়াই
কিন্তু….. এসব কি আর বেশিদিন সয়? আমেরিকা আর সোভিয়েতের; তৎকালীন Cold War এর প্রভাব পড়তে লাগল আফগানিস্তানের উপর। পৃথিবীটা মোটামুটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল; একদল আমেরিকার পা চাটতে লাগল; আর একদল সোভিয়েত ইউনিয়নের। ঠান্ডা লড়াই এর আগে দাউদ খান দীর্ঘদিন; সোভিয়েতের সাহায্য নিয়ে আফগানিস্তানে ব্যাপক শিল্প শিক্ষা বিষয়ক উন্নতি করেছিল। ভারতকে দেখে আফগানরাও পুরোপুরিভাবে, সোভিয়েত নির্ভরতা ছেড়ে; আমেরিকা আর সোভিয়েত দুই দেশের সঙ্গেই সমান সম্পর্ক বজায় রাখা শুরু করল; যেটা সোভিয়েত মোটেই ভালো নজরে দেখল না।

এরপর আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে; আদর্শগত কারনে দুটো দলের সৃষ্টি হয়। তাদের সঙ্গে এবং ইসলামিক এক্সট্রিমিস্ট-দের সঙ্গে; দাউদের দারুণ মতপার্থক্য শুরু হয়ে যায়। ক্ষমতা লোভী দাউদ প্যারানয়েড হয়ে পড়ে; এবং প্রচুর বিরুদ্ধ মতের নেতাকে হত্যা শুরু করে দেয়। এককালের উন্নয়নকারী দেশপ্রেমিক ডিক্টেটরের; আসল রূপ বেরিয়ে পড়তে থাকে।

কিন্তু কমিউনিস্ট রেভলিউশনের সামনে; আবার আরও এক ডিক্টেটরের পতন ঘটে। এবং কমিউনিস্ট নেতা নূর মহম্মদ তারাকির নেতৃত্বে; ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক দেশ আফগানিস্তান তরতর করে উন্নতির সিঁড়ি চড়তে থাকে। তারাকি আবার দাউদের শেষ সময়ের অন্ধকার পর্দা সরিয়ে; নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখায়। মেয়েদের জন্য প্রচুর স্কুল বানায়; মৌলবীদের ক্ষমতাচ্যুত করে দেয়; ধর্মান্ধতার ব্যাপক বিরোধিতা করতে থাকে। ফলে যা হওয়ার তাই হয়, এমনিতেই কমিউনিস্টরা দুই দলে ভেঙে গেছিল; এরপর তারাকির কর্মকান্ডে ক্ষেপে গিয়ে; ইসলামিক পার্টি সরাসরি গৃহযুদ্ধের ডাক দেয়। এই ত্রিপক্ষীয় যুদ্ধে, আর এক কমিউনিস্ট নেতা হাফিজুল্লার হাতে খুন হয়; কমিউনিস্ট নেতা তারাকি।

সাল ১৯৭৯
এবার ‘কমিউনিজম খতরে মে হে’; নাড়া লাগিয়ে সোভিয়েত চলে আসে আফগানিস্তানে! তারাকিকে হত্যা করে হাফিজুল্লা গদি দখল করলেও; তারাকির মতো ভুল সে করতে চায়নি। তাই ইসলামিক পার্টির ভয়ে, সে গলা ফাটিয়ে কোরান কোট করতে শুরু করে; প্রচুর মসজিদ বানায়; ধর্মান্ধতা প্রমোট করতে শুরু করে। সুতরাং অবশ্যই কমিউনিস্টদের নাম খারাপ হচ্ছিল; তাই সোভিয়েত এসে আমিন মিঞার কোতল করে।

এছাড়াও আরো একটা কারণ ছিল; কোল্ড ওয়ার এ আমেরিকার বিরুদ্ধে আরো একটা দেশকে নিজের দলে টানা। তাই সোভিয়েত নিজের পছন্দের কমি নেতা বাবরাক কর্মাল-কে প্রেসিডেন্ট বানায়; এবং সে গদিতে বসে প্রথমেই তিন হাজার রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্ত করে। এবং আমিন এর ধর্মান্ধ সংবিধান পুড়িয়ে; নতুন লিবারেল সংবিধান লাগু করে।ফ্রিডম অফ স্পিচ; ভোট; স্বাধীন ভাবে নিজ ধর্মপালন ফিরে আসে।

এদিকে ভিয়েতনাম ইথিওপিয়া বিভিন্ন জায়গায়; সোভিয়েতের কাছে মার খেয়ে আমেরিকার তখন নাজেহাল দাশা। কমিউনিস্ট-গুলো এবার আফগানিস্তানেও আখড়া জমিয়েছে; এটা আমেরিকা কিভাবে সহ্য করবে! সুতরাং তাদের বিরোধিতায় কে আছে; তাকে খুঁজে বের করে অন্ধ সাপোর্ট করা শুরু করে আমেরিকা। সে আর কেউ নয়; ইসলামিক পার্টির এক্সট্রিমিস্ট রাইটিস্ট মুজাহিদ্দিন। আমেরিকার সঙ্গে জুটে যায় পাকিস্তান; সৌদি আরব। তারাও রাইটিস্ট মুজাহিদ্দিনকে ব্যাপক আর্থিক সাপোর্ট; আর অস্ত্র পাচার করা শুরু করে দেয়।

সাধারণ গেরিলা যোদ্ধা মুজাহিদ্দিনের হাতে এসে যায়; অফুরন্ত টাকা, আধুনিক অস্ত্র, এমনকি অ্যানটি এয়ারক্র্যাফট মিসাইল। সুতরাং লেফটিস্ট-রাইটিস্ট লড়াই; জোরকদমে চলতে থাকে; সঙ্গে আমেরিকার অস্ত্র ব্যবসা।

সাল ১৯৮৮
পাকিস্তান আফগানিস্তান; জেনিভা শান্তি চুক্তি সই করে। এবং আমেরিকা কথা দেয়, সোভিয়েত চলে গেলে; তারাও মুজাহিদ্দিনকে অস্ত্র সাপ্লাই বন্ধ করে দেবে। ওদিকে সোভিয়েত তখন টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে; সেই চাপে আফগানিস্তান থেকে পিছু হঠে যায় তারা।

সাল ১৯৮৯
নতুন প্রেসিডেন্ট নাজিবুল্লা সমস্ত কমিউনিস্ট নিয়মকানুন হটিয়ে; আফগানিস্তানকে পুরোপুরি ইসলামিক স্টেট ঘোষণা করে। One Party রুল বন্ধ হয়; আফগান রাজত্বে। প্রচুর পরিমানে Foreign Aid, Industrial Investment আসতে থাকে; কিন্তু সোভিয়েত চলে গেলেও আমেরিকা; মুজাহিদ্দিনকে গোপনে সাপোর্ট করে যেতে থাকে মিলিয়ন ডলারে।

সাল ১৯৯২
আমেরিকার ব্যাপক মদতে মুজাহিদ্দিন ভোটে জেতে; এবং নতুন নেতা বুরহান রাব্বানির সময়ে মার্কেটে আসে নতুন খেলোয়াড় ‘তালিবান’। আর এখান থেকেই শুরু; আফগানিস্তানে তালিবান রাজ।

সাল ১৯৯৬
তালিবান শব্দের অর্থ Student; মোল্লা ওমরের নেতৃত্বে মাত্র ৫০ জন ছাত্র নিয়ে তৈরি হয় এই সংগঠন। পরে আস্তে আস্তে পাকিস্তান থেকেও, প্রচুর পাখতুনিস রিফিউজি; এই তালিবান দলে যোগ দেয় এরা মুজাহিদ্দিনের থেকেও কয়েক কাঠি উপরের; রাইট উইং এক্সট্রিমিস্ট ছিল। এরাই আফগানিস্তান সরকারকে বিপাকে ফেলতে পারে আঁচ করে; তালিবানকে তখন পাকিস্তান আর সৌদি ফুল সাপোর্ট করল।

তালিবানের জন্মের পিছনে; আমেরিকার অবদানও অনস্বীকার্য। গোটা দেশ জুড়ে যখন কিছু ভালো মানুষ, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে; তখন মিলিয়ন ডলারে আর্থিক সাহায্য, অস্ত্র সাপ্লাই, ভায়োলেন্ট এক্সট্রিমিস্ট রাইট উইং টেক্সট বুক সাপ্লাই করে গেছে আমেরিকা; যার ফলাফলই আজকের এই তালিবান।

সাল ১৯৯৬
আমেরিকা পাকিস্তান সৌদি আরবের ব্যাপক সাহায্যে; তুমুল শক্তিশালী তালিবান গোষ্ঠী আফগানিস্তান দখল করে; ইসলামিক এমিরেট অফ আফগানিস্তান প্রতিষ্ঠা করে। শুরুতে মানুষ কিছুটা শান্তির আভাস পেলেও; কয়েকবছরের মধ্যেই এক্সট্রিম রাইট উইং লিডারশিপের আন্ডারে থাকার মজা টের পেল আফগানরা।

আফগানিস্তানে ব্যান হয়ে গেল সিনেমা; গান, থিয়েটার, ভিসিআর, ফুটবল, দাবা, ঘুড়ি ওড়ানো, ছবি আঁকা, ফটোগ্রাফি, ক্লিন শেভ, ফরেনার, এনজিও, ইন্টারনেট, ১০ বছরের অধিক বয়সী মেয়েদের শিক্ষার অধিকার। ভাবতে পারছেন না তো ? আচ্ছা আর একবার পড়ুন; ব্যান হয়ে যাওয়া লিস্টটা। দাড়ি আর বোরখা ম্যান্ডেটরি হয়ে গেল; পুরুষ আত্মীয় ছাড়া মেয়েদের ঘর থেকে বেরোনো নিষিদ্ধ হয়ে গেল।

আর এই ধর্মীয় ঝড়ে শুধু হিন্দু, খ্রিস্টান না; হাজারে হাজারে নন পাশতুন মুসলিমও খুন হল। সঙ্গে শেষ কমিউনিস্ট শাসক; নাজিবুল্লাও খুন হয়ে গেল। এবং একটা গোটা দেশের শিল্প সংস্কৃতি কালচার; সব খুন হতে থাকল। ন্যাশনাল মিউজিয়ামের এবং দেশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসাধারণ সব শিল্পকর্মের; প্রায় ৮০% ধ্বংস করে ফেলল তালিবানরা। সাধারণ আফগানিরা এই পৃথিবীর বুকেই; ছোট্ট একটা নরক দেখে নিল।

সাল ১৯৯৮
তালিবান-দের এই নোংরামি, পাকিস্তান সৌদি আরব UAE সাপোর্ট করলেও; বেশিরভাগ দেশ এর তীব্র নিন্দা করে এবং মাসুদ আহমেদের নেতৃত্বে; নর্দান অ্যালাইন্স লড়াইয়ে নামে; তালিবান-দের বিরুদ্ধে।

সাল ২০০১
নর্দান অ্যালাইন্স এই অসম লড়াই হেরে যায়; এবং মাসুদ আহমেদ খুন হয়। এই ঘটনার দুই দিন পর, সারা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়ে; আল কায়দা আমেরিকার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলা করে। বিশ্বের ইতিহাসে কলঙ্কিত; ৯/১১ আক্রমণ। ওসামা বিন লাদেন আমেরিকাকে খোলা চিঠিতে বার্তা দেয়; “সোমালিয়া লিবিয়া আফগানিস্তানে আমেরিকা যে নোংরামি করেছে; এটা তারই প্রতিশোধ”। লজ্জায় অপমানে পাগল হয়ে মহাশক্তিধর আমেরিকা; ক্ষ্যাপা কুত্তার মতো খুঁজতে থাকে লাদেনকে।

মুহুর্মুহু এয়ার স্ট্রাইক করতে থাকে তালিবান ঘাঁটিগুলোতে; যাতে আফগানিস্তানের প্রচুর সাধারণ মানুষেরও প্রাণ যায়। বামিয়ানের বিখ্যাত বুদ্ধমূর্তি ধ্বংসের আওয়াজ চাপা পড়ে যায়; একে ৪৭ ও বিমান হামলার বিকট শব্দে।

সাল ২০০৪
নর্দান অ্যালাইনসের সাহায্যে আমেরিকা; তালিবানদের উপর ব্যাপক হামলা করতে সক্ষম হয়। কিন্তু পাহাড়ি জঙ্গলে গোপন সুড়ঙ্গে আস্তানায়; দিনের পর দিন লুকিয়ে থাকা তালিবানদের পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করা কি এতই সোজা ?! তাও সাময়িক পিছু হাটানো গেল বটে তালিবান-দের; কারজাই নতুন প্রেসিডেন্ট হয় এবং ভারতের সঙ্গে তখন বেশ সুসম্পর্ক তৈরি হয়। আমেরিকা এদিকে পাকিস্তানেও বোম্বিং করতে থাকে; সেখানকার তালিবান হাইড আউট-গুলো ধ্বংস করার জন্য।

সাল ২০১১
আমেরিকা কর্তৃক নিকেশ; আল কায়দা প্রধান ও ৯/১১ হামলার চক্রী লাদেন।

সাল ২০১৩
তালিবান এর জন্মদাতা মোল্লা ওমর এর মৃত্য হয়; কোনো এক অজানা রোগে।

সাল ২০২০
কিন্তু রক্তবীজের ঝাড় এই তালিবানরা; ধর্ম আর পাশতুন ন্যাশেনালিজমের আগুন বুকে নিয়ে; এক এক জায়গা থেকে এক এক লোকাল নেতার অধীনে বারে বারে ফিরে আসে তারা। প্রতিবেশী দেশে, বর্ডারে; বারংবার বিচ্ছিন্ন জঙ্গী হামলা চলতেই থাকে। আর এই পুরো সময় আমেরিকা; আফগানিস্তানে তাদের সৈন্য মোতায়েন করে রেখে দেয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম তখন তালিবান-দের সঙ্গে; সরাসরি কথোপকথন শুরু করে। এবং তাদের বলে তালিবানরা যদি আল কায়দার মতো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন করে; তাহলে আমেরিকা তাদের সৈন্য সরিয়ে নেবে।

কারন এত বছর ধরে নিজেদের সৈন্য আফগানিস্তানে রাখতে; সাকুল্যে ২ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হয়ে গেছে আমেরিকার। এদিকে সাধারণ আমেরিকাবাসীও চায়না; অন্যের ঘরের লড়াইতে রোজ তাদের ঘরের ছেলে-ভাই-স্বামী শহিদ হোক।

সাল ২০২১
তালিবানরা তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালীভাবে সংগঠিত হয় এই সময়; আবার ঠিক এই সময়ই ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও; মানুষের মতে সমর্থন জানিয়ে; আফগানিস্তান থেকে সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এবং তালিবানরা আরো একবার তাদের; ইসলামিক এমিরেটস অফ আফগানিস্তানের স্বপ্ন সফল করে। আরো একবার চরম সমস্যায়; সেই আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষই।

প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়
যদি প্রতিশোধই নেওয়ার ছিল, তাহলে ২০১১তে লাদেন মরার পরে বা ২০১৪তে মোটামুটি শান্তি প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরে; আমেরিকা কেন সৈন্য সরায়নি ?? আর যদি আফগানিস্তানে ডেমোক্রেসি প্রতিষ্ঠাই প্রধান কারণ হয়; নতুন আফগানিস্তান প্রতিষ্ঠাই আসল লক্ষ্য হয়; তাহলে এখন কেন সেনা সরিয়ে নিল আমেরিকা; যখন তালিবানরা সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী ?? আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ; কোথায় দাঁড় করিয়ে গেল তারা? আফগানিস্তানের নারীদের; কাদের হাতে ছেড়ে গেল তারা ? প্রশ্নের জবাব কিন্তু; আমেরিকাকে দিতেই হবে।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন