কলকাতাকে লন্ডন বানানোর রসিকতা ছাড়ুন, ক্যালকাটা-লন্ডন বাস পরিষেবা ছিল বিশ্বের বিস্ময়

3778
কলকাতাকে লন্ডন বানানোর রসিকতা ছাড়ুন, ক্যালকাটা-লন্ডন বাস পরিষেবা ছিল বিশ্বের বিস্ময়
কলকাতাকে লন্ডন বানানোর রসিকতা ছাড়ুন, ক্যালকাটা-লন্ডন বাস পরিষেবা ছিল বিশ্বের বিস্ময়

কলকাতাকে লন্ডন বানানোর রসিকতা ছাড়ুন; একসময় কলকাতা-লন্ডন বাস পরিষেবা ছিল বিশ্বের বিস্ময়। পৃথিবীতে কত কীই যে; অজানা থাকে! কলকাতা ও লন্ডনের যোগ ছিল অত্যন্ত নিবিড়; ব্রিটিশ আমলে এই দুই শহরকেই সমীহ করত বিশ্ববাসী। পশ্চিমি অত্যাধুনিক সভ্যতার ধারা, লন্ডন থেকে সোজা; ‘ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী’ কলকাতায় এসে পৌঁছত। ঠিক সেই কারণেই একসময়; লন্ডন-কলকাতা বাস পরিষেবাও চালু ছিল। শুনতে বেজায় খটকা লাগল তো? একদমই ঠিক; গল্প হলেও সত্যি! সুদূর লন্ডন থেকে বাস আসত; তিলোত্তমা কলকাতায়। সেই বাসে কলকাতায় আসতেন; লন্ডনের অভিজাত ধনীরা। লন্ডন ঘুরতে যেতেন; ভারতের ধনীরা।

কি অবাক হচ্ছেন? অবাক লাগলেও এটাই সত্যি। লন্ডন থেকে সরাসরি কলকাতায়; আসা যেত একটি বাসে! সরাসরি কলকাতা থেকে লন্ডন, ৬০ বছর আগে, ৬০ এর দশকে; পৃথিবীর দীর্ঘতম বাস রুট ছিল এটিই। সকালে উঠে ব্যাগ গুছিয়ে, কলকাতা থেকে উঠে পড়লেন বাসে; তারপর ৫ দিন পরে সোজা পৌঁছে গেলেন লন্ডন! কোনো প্লেন, জাহাজ নয়; স্রেফ একটা বাসে করেই চলে যাওয়া বিলেতে! ব্যাপারটা খানিক অদ্ভুত লাগছে না! অবশ্য একটা সময়; এই অদ্ভুত ব্যাপারটাই ঘটত।

আরও পড়ুনঃ ভারতের প্রথম মহিলা চিকিৎসক কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মদিনে আমেরিকার গুগলের শ্রদ্ধার্ঘ্য

কলকাতা আর লন্ডনকে মিলিয়ে দিয়েছিল; একটি বাস। শুধু এই দুটো শহরকেই নয়, মিলিয়ে দিয়েছিল; বিশ্বের আরও ১১ টি দেশকেও। এমনই জাদু ছিল ‘অ্যালবার্ট’-এর। ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডন থেকে কলকাতা পর্যন্ত; এই বাসটি ২০ হাজার ৩০০ মাইল দূরত্ব পেরত। বাসটির নাম ছিল ‘অ্যালবার্ট’; সম্প্রতি লন্ডনের ভিক্টোরিয়া কোচ স্টেশনের ১৯৫০-এর দশকের সেই বাসের ছবি; সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। ছবিতে বিশ্বের দীর্ঘতম এই রুটের বাসে ওঠার আগে; যাত্রীদের ছবি ক্যামেরাবন্দি করা হয়।

৬০-৭০ এর দশকে ক্যালকাটা-লন্ডন বাস পরিষেবা
Calcutta London Bus Service
৬০-৭০ এর দশকে ক্যালকাটা-লন্ডন বাস পরিষেবা

১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত, ১৫ বার; লন্ডন থেকে কলকাতা যাতায়াত করেছিল ‘অ্যালবার্ট’ বাস। লন্ডন থেকে কলকাতা হয়ে; অস্ট্রেলিয়ার সিডনি পর্যন্ত যাতায়াত করেছিল ৪ বার। তখনও ক্যালকাটা, ‘কলকাতা’ হয়নি; সালটা ১৯৬৮। অ্যান্ডি স্টুয়ার্ট নামের এক ব্রিটিশ পর্যটক; সিডনি থেকে নিজের শহর লন্ডনে ফেরার পরিকল্পনা করেছিলেন। তার জন্য ঠিক করলেন; একটি রোমাঞ্চকর জার্নি। একটা মনোরম, সুন্দর ডাবল ডেকার বাস নিলেন; সঙ্গে জুটল আরও ১৩ জন।

সবাই মিলে, ৬৮-এর অক্টোবরে; সিডনি থেকে পাড়ি দিলেন লন্ডনের দিকে। কলকাতায় পৌঁছনোর আগে; ট্রেন এবং জাহাজে করেই পাড়ি দিয়েছিলেন। কলকাতা থেকে শুরু হয়েছিল টানা রাস্তা; তৈরি হল পৃথিবীর সবথেকে লম্বা বাস রুট। জন্ম হল ‘অ্যালবার্ট’-এর। সত্তরের দশকে রীতিমতো বিখ্যাত ছিল; এই বাসটি। ভেতরে ফাইভ স্টার বন্দোবস্ত; স্বাভাবিকভাবেই খুব বেশি যাত্রী নেওয়া যেত না। আর অনেকের; সামর্থ্যও ছিল না। দীর্ঘ যাত্রা পথে ওই বাসটি; শুধু সড়ক পথে ছুটত না; পেরতে হত জলপথও। সেক্ষেত্রে ফেরির সাহায্য নেওয়া হত; বলে জানা গেছে।

আরও পড়ুনঃ মহারাজের গোপন অভিসারে ভারতের মানচিত্র বদলে, রাজপুতানা চলে যাচ্ছিল পাকিস্তানে

কলকাতা থেকে লন্ডনে যাওয়ার, সিঙ্গল ট্রিপের ভাড়া ছিল ৮৫ পাউন্ড; ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৮ হাজার টাকা। যা তখনকার হিসেবেও; বেশ দামি ছিল। লন্ডন থেকে বাসটি ছেড়ে; যেত বেলজিয়াম। সেখান থেকে পশ্চিম জার্মানি; অস্ট্রিয়া; যুগোস্লোভিয়া; বুলগেরিয়া; তুরস্ক; ইরান; আফগানিস্তান; পশ্চিম পাকিস্তান হয়ে; ভারতে ঢুকত। ভারতে ঢুকে দিল্লি, আগ্রা, এলাহাবাদ, বারাণসী হয়ে; কলকাতা পৌঁছত।

৪৫ থেকে ৫০ দিন সময় লাগত; লন্ডন থেকে কলকাতা পৌঁছতে। ওয়ান সাইড ট্র্যাভেলে ফুডিং, লজিং-সহ, সব লাক্সারি সুবিধা নিয়ে; টিকিটের মোট দাম পড়ত ১৪৫ পাউন্ড (বর্তমানে ১৩ হাজার ৬৪৪ টাকা)৷ লাক্সারি বাসটির ট্যাগ লাইন ছিল; ‘Your Complete Home while You Travel. একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ১৯৫৭ সালে লন্ডন থেকে কলকাতা যাত্রার সময়ে; যুগোস্লোভিয়ায় একটি নদীর ধারে পিকনিক সেরে; ফের বাসে উঠছেন জনা ২০ ব্রিটিশ নাগরিক।

কিন্তু যারা এই বাসে চড়তেন; তাঁরা এক অদ্ভুত অ্যাডভেঞ্চারের সাক্ষী থাকতেন। মোট ১৫০টি সীমান্ত পেরোত অ্যালবার্ট; তবে সমস্যা হয়নি কোনো। মূলত কলকাতা আর লন্ডনের মধ্যে হলেও; চারটে ট্রিপ করা হয় সিডনি থেকেও। শেষ ট্রিপটি ছিল ১৯৭৬ সালে; যাত্রা থামলেও, ইতিহাস কি আর সহজে ভোলা যায়! আবার যদি শুরু করা যায়? পর্যটক হবে, বলছেন টুর অপারেটররা; কিন্তু বিশ্বের ১১ টা দেশের মধ্যে দিয়ে আর শান্তিতে বাস নিয়ে যাওয়া যাবে কিনা; সেটাই এখন বড় প্রশ্ন!

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন