“কি বে #য়োরের বাচ্চা, এতক্ষণে আসার সময় হল”

2953
কি বে .য়োরের বাচ্চা, এতক্ষণে আসার সময় হল
কি বে .য়োরের বাচ্চা, এতক্ষণে আসার সময় হল

“কি বে #য়োরের বাচ্চা; এতক্ষণে আসার সময় হল?” “দুদিন ধরে অন্ধকারে পড়ে আছি আমরা; আর তোরা এখন আসছিস? এই বাঁধ, বাঁধ… বেঁধে রেখে দে দুই বান#দকে। যতক্ষণ না কারেন্ট আসে”। বেহালার নাম না জানা এক গলিতে গাড়ি থেকে নামতেই; আমাদের দুজনের দিকে তেড়ে এল; জনা পনেরো স্থানীয় বাসিন্দা। আমরা মানে আমি অনির্বাণ সরকার ও আমার সহকর্মী শুভ্রকিশোর বাসু। বছর বাইশেক হয়ে গেল এই চাকরিতে। এসব এখন আর গায়ে লাগে না। আমাদের আউটডোর জবে; মা-বাবার মান-সন্মান বন্ধক রেখেই; চাকরি করতে হয়। এগুলো এখন আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে।

ব্যর্থ CESC, বিদ্যুৎবিহীন এলাকা, দায় নেই রাজ্য সরকারের

শুধু একটা ব্যাপার বুঝতে পারছিলাম যে; সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং-র মা-মাসি-এলোকেশী হয়ে যাচ্ছে। তর্জনি উঁচিয়ে জনা পাঁচেক লোক; তখন একেবারে আমাদের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। বছর বিশেক আগে হলেও; এসব ক্ষেত্রে খুব রাগ হত। হয়তো প্রাণপণে বোঝানোর চেষ্টা করতাম ঐ জনতাকে; যে আপনাদের জন্যই 24 ঘন্টা পার করে 48 ঘন্টার ডিউটি করছি। ঝড়ের আগে এবং ঝড়ের পরপরই জীবন বাজি রেখে; সেই তান্ডবলীলার দুপুর থেকে রাত সাড়ে তিনটে পর্যন্ত; বজবজ, বড়িশা, ঠাকুরপুকুর চত্বর জুড়ে ফল্ট রিপ্যায়ারিংয়ের কাজ করেছি।

নামল সেনা রাস্তা সাফ, তবু দেখা নেই CESC র, বিদ্যুৎ ও নেই

রাতে মাত্র 3 ঘন্টা রেস্ট। তারপর আবার সকাল থেকে সিরিটি, ডায়মন্ড সিটি…. ঘুরছি তো ঘুরছিই। বছর বিশেক আগে হলেও; কখনও সখনও খুব মনখারাপও হত। মনে হত এদের জন্যই কি নিজের চাকরি বাজি রেখে; পুওর নেটওয়ার্কের ভ্রুকুটি মাথায় নিয়ে কন্ট্রোল রুমের কথা কাটাকাটা ভাবে অর্ধেকটা শুনে; আর অর্ধেকটা ভিডিও রেকর্ডিং করে সুইচের থেকে অনেক দূরে যেখানে নেটওয়ার্ক কাজ করছে; সেখান থেকে কথা বলে প্রচুর ঝুঁকি নিয়ে একটা সুইচ অন বা অফ করেছি?

বাম আমলেই বেড়েছে CESC, বিদ্যুৎ নিয়ে ক্ষুব্ধ মমতা

পবিত্র রমজান মাসে আমার চেনা চোখে; একেবারেই অচেনা, অজানা, সান্নাট্টা মেটিয়াব্রুজে গাছের সাথে ছিঁড়ে যাওয়া হাইটেনশন লাইনকে উপেক্ষা করে; মোটা মোটা গাছের গুঁড়ি টপকে এই মানুষদের ঘরেই আলো জ্বালানোর জন্যই; কি রাত দেড়টা নাগাদ ছুটে গেছি?

মমতার বিরুদ্ধে গিয়ে CESC এর প্রশংসা কলকাতা পুলিশের

নাহ….অনেক বছর হয়ে গেল; এসব রাগ, দুঃখ, অভিমান কে প্যান্টের হিপ পকেটে পুরে ফেলেছি। করোনার আবহে অর্ধেকেরও কম লোক নিয়ে কাজ করতে গিয়ে; এই মারণ-ঝড়ে নাকানি-চোবানি খেয়েও মাথাটা হিমশীতল; আর স্নায়ুকে ইস্পাত কঠিন রাখতে শিখে গেছি। আমার সহকর্মী শুভ্রও তাই।

অন্ধকারে বাংলা, দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইলেকট্রিক বিল নিয়েও চরম ব্যর্থ CESC

খিস্তি খেয়েও ঠান্ডা মাথায় একগাল হেসে লোকগুলোকে বললাম; “কোনও অসুবিধে তো নেই দাদা। আপনারা আমাদের ধরে রাখুন; বেঁধে রাখুন তাতে যদি আপনাদের বাড়িতে আলো আসে; তাতে আমার একেবারেই সমস্যা নেই। বরং এখানে বসে থাকলে; আমাদের বেশি ছোটাছুটি আর করতে হবে না। আমাদের হেড অফিসে খবর পাঠালে; তারা এক্ষুনি পুলিশ পাঠিয়ে আমাদের ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে। মাঝখান থেকে আজ আর আপনাদের আলো জ্বলবে না ঘরে। সেটা কি ভালো হবে?”

CESC এর সঙ্গে মমতার ১৩ হাজার কোটি টাকার, দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিলেন মুকুল রায়

এসব কথায় ম্যাজিকের মত কাজ হয়। বহু অভিজ্ঞতার ফল; একেবারে সরকারের R চিহ্নপ্রাপ্ত। সুড়সুড় করে সরে গিয়ে; রাস্তা করে দিল জনতা। সেই তারাই, যারা আরেকটু হলে গায়ে হাতই তুলতে যাচ্ছিল। 48 ঘন্টা টানা ডিউটিতে; 10 খানা ফল্টের কাজ। অদ্যাবধি আমার সর্বোচ্চ। চলে আসার সময় মনে হচ্ছিল; লোকগুলোকে জিজ্ঞেস করি, এই আপনারাই তো সব 22 শে মার্চ ‘জনতা কারফিউ’ র দিন; তালি বাজিয়ে, থালি বাজিয়ে দেশসেবকদের জন্য দেশভক্তির বান ডাকিয়ে দিয়েছিলেন না?

এলেন দেখলেন জয় করলেন, সেনার হাতে রাস্তায় পড়ে থাকা গাছ সাফ

তারপর মনে হল; যাক গে বাদ দিই ওসব বেকার কথা। নিজের মন থেকেই যে ফেরেব্বাজিকে ঘেন্না করি; যে নাটকবাজিকে পাত্তা দিই না, আজ ব্যস্ততার সময় সেসব কথা নিয়ে সময় নষ্ট করা; একেবারেই নৈব নৈব চ। আসলে আমার কাছে আমার চাকরি হচ্ছে পেশার জায়গা; পেশাদারিত্বের জায়গা। সময়মতো অফিস যাও, কাজ করো, বাড়ি ফেরো, মাইনে নাও; সংসার প্রতিপালনে খরচ করো সেই অর্থ। খুব সহজ এবং সরল দৃষ্টিভঙ্গি।

দিলীপ ঘোষকে আটকাতে শয়ে শয়ে পুলিশ, গাছ কাটছে সেনা

এর মধ্যে দেশসেবার কোনও ঢক্কানিনাদ নেই। এক্ষেত্রে আমার চিন্তা চেতনা একেবারে সীমিত; আমিন পরিচালিত নানা পাটেকর অভিনীত ‘অব তক ছাপ্পান’ সিনেমার মূখ্য চরিত্র সাধু আগাসের মত। এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট সাধু আগাসে তার জুনিয়র সতীর্থকে বলেছিলেন; “হর এনকাউন্টার কে বাদ ইয়ে সোচকে খুশ রহতা হুঁ; কে ম্যায় আভিতক জিন্দা হুঁ । অওর কুছ নহী। দেশভক্তি ওয়ক্তি কুছ নহী”।

শিক্ষা নেয়নি রাজ্য সরকার, বাবুলের পর দিলীপকে আটকে ‘ব্লান্ডার’

তবুও… কখনও কখনও… কিছু অনুভূতি মন ছুঁয়ে যায় আজও। আমফান (নাকি উম্পুন?) এর দিন ডিউটিতে আছি জেনে; বহু আত্মীয়, বন্ধু, পরিচিত, পরিজনেরা মাঝেমধ্যেই খবর নিয়েছে; বাড়ির লোকেদের কুশল জানতে চেয়েছে; নিজের বাড়িতে আলো নেই তবুও আমি কেমন আছি, ঠিক আছি কিনা জানতে চেয়েছে। আমার উত্তর কোলকাতার বহুদিনের পুরনো বাড়ির; এই মারাত্মক ঝড়ের ঝাপটায় কোনও ক্ষতি হল কিনা; বারবারই খবর নিয়েছে।

পঞ্চায়েত নেতাদের বিশ্বাস নেই, সরাসরি মানুষকে টাকা দেবেন মমতা

আবার অনেকেই বলেছে- তোমরা সজাগ আছ; তাই আমরা শান্তিতে ঘুমোতে পারছি। বাড়িতে আলো এসে গেছে দাদা। আমার মেয়ে আমাকে নিয়ে গর্ববোধ করবে কি করবে না সেটা ভবিষ্যতের প্রশ্ন; তার উত্তর কালের গর্ভে নিহীত। কিন্তু এসব কথাগুলো শুনলে মনে হয় তালি বা থালি বাজানো নয়; এই সব আমারই মত সাধারণ মানুষের কাছ থেকে এতবড় সন্মান পাওয়া; এগুলোই তো আমাদের কাজের স্বীকৃতি। এগুলোর জন্যই তো মহামারী, মহাপ্রলয়ের করাল অন্ধকারের মধ্যেও; কোথাও যেন খেলে যায় জীবনের রূপোলি রেখা। আঁধারে জেগে ওঠে আশার ‘আলো’।

সঠিক তথ্য না দিলে উল্টো ফল, মমতাকে হুঁশিয়ারি রাজ্যপালের

এ শহর কোনও প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যপাল, পঙ্গপাল, মন্ত্রী, সান্ত্রী, আমলা, সামলা, গামলা বা গয়লার বাপের জমিদারি নয়; এ শহর আমার শহর, এ শহর আপনার শহর। অনেক না পাওয়ার মধ্যেও; অনেক কিছু পাওয়ার শহর। এ শহরকে দুহাতে আগলে রেখে; বুকে জড়িয়ে নিয়ে বাঁচতে হবে, বাঁচাতে হবে। হোক যতই কষ্ট, শরীর যতই হোক অবসন্ন; এ শহরকে আবার আলোকোজ্জ্বল করে তুলতেই হবে। মন্ত্র হোক একটাই – চরৈবেতি, চরৈবেতি, চরৈবেতি ।।।

সোমবার থেকে দেশে শুরু বিমান চলাচল, বাংলায় শুরু কবে

48 ঘন্টা লড়াইয়ে ক্লান্ত, অবসন্ন শরীর টা ভারি হয়ে আসে। চোখের পাতায় যেন রাজ্যের ঘুম। বাড়ি ফেরার পথে কানে গুঁজে নিই; মোবাইলের হেডফোন। প্রাণ ভরিয়ে, মন জুড়িয়ে কানের মধ্যে দিয়ে তখন মরমে পশে যাচ্ছে চির-কিশোর – “এক রাস্তা হ্যায় জিন্দেগি… যো থাম গয়ে উয়ো কুছ নহী……..…”

লিখলেন, CESC কর্মী অনির্বাণ সরকার; নিজের ফেসবুক পেজে।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন