২১শে জুলাই ১৩ জনের মৃত্যুর জন্য, মমতা ও কংগ্রেস দুষ্কৃতীদেরই দায়ী করে সিপিএম

6242
২১শে জুলাই ১৩ জনের মৃত্যুর জন্য, মমতা ও কংগ্রেস দুষ্কৃতীদেরই দায়ী করে সিপিএম
২১শে জুলাই ১৩ জনের মৃত্যুর জন্য, মমতা ও কংগ্রেস দুষ্কৃতীদেরই দায়ী করে সিপিএম

১৯৯৩ সালের ২১শে জুলাই, ১৩ জনের মৃত্যুর জন্য; মমতা ও কংগ্রেস দুষ্কৃতীদেরই দায়ী করে সিপিএম। কি রিপোর্ট দিয়েছিল; সিপিএম নেতারা? এখনও সোশ্যাল মিডিয়ায় কি লেখেন; সিপিএম নেতারা। দেখে নিন একনজরে। ২১শে জুলাই ১৯৯৩; সেদিন কি ঘটেছিল……৩টি বাস পোড়ানো হয়েছিলো; ৩৫টি গাড়ি ভাঙচুর হয়েছিল। গুলি-বোমা-পাথরে; জখম হন ২১৫ জন পুলিশ। ধর্মতলায় সাংবাদিক মার খেয়েছিলেন; ঘটনার দিন। ‘বহু সশস্ত্র দুষ্কৃতী (অ্যান্টিসোস্যাল) নেশাগ্রস্ত অবস্থায় জড়ো হয়েছিল’; নিজের রিপোর্টে জানান পরবর্তীকালে মমতা সরকারের মন্ত্রী মণীশ গুপ্ত।

মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে গাড়ি থেকে নামাতে ছদ্মবেশ সোনালীদের; মৃতদের একজনের নাম জানে না তৃণমূল; ১জন মারা যায় ‘সিরোসিস অব লিভারে’। আন্দোলনের বিরোধিতা করে; জ্যোতি বসুর শরণাপন্ন হন গণি খান চৌধুরী। জন্মের আগেই ২১শে জুলাই; চরিত্র বুঝিয়েছিল তৃণমূল! মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন কোনও দল কী হতে পারে; কী কী করতে পারে তা স্পষ্ট করেছিল ১৯৯৩ সালের ২১শে জুলাই-ই।

আরও পড়ুনঃ ২৮ বছর পরেও খুঁজে পাওয়া যায়নি, ২১ শে জুলাইয়ের ১৩ তম শহিদ কে

১৯৯৩; ২১ শে জুলাই। মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু; স্বরাষ্ট্রসচিব মণীশ গুপ্ত। তৃণমূল কংগ্রেস; তৈরিই হয়নি। মমতা ব্যানার্জি, যুব কংগ্রেসের সভানেত্রী; ডাক দিয়েছিলেন ‘মহাকরণ অভিযান’-এর। ঘোষণা ছিল ‘মহাকরণ দখল করা হবে’; যদিও কংগ্রেস এই ‘অভিযান’-এর বিরোধিতা করে। জানা যায়, কংগ্রেস নেতা এবিএ গণিখান চৌধুরী; নয়া দিল্লির বঙ্গভবনে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে দেখা করেছিলেন; ২১শে জুলাইয়ের আগে।

গণি খান চৌধুরী সেদিন পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলা, শক্ত হাতে রক্ষা করার জন্য; মুখ্যমন্ত্রী যে ধরনের ব্যবস্থা নেবেন তাকে নিঃশর্তে সমর্থন জানানোর প্রতিশ্রুতি দেন। জ্যোতি বসুকে গণিখান চৌধুরী বলেন; “গুন্ডামি করে মহাকরণে মুখ্যমন্ত্রীকে ঢুকতে না দেওয়া; গণতান্ত্রিক আন্দোলন হতে পারে না। আপনাকে আমি নির্বাচনের মাধ্যমে; গদি থেকে টেনে নামানোর চেষ্টা করবো। আপনিও তার বিরোধিতা করবেন; কিন্তু কেউ যদি জোর করে আপনার চেয়ারটা; কেড়ে নিতে চায় তা হলে সেটা হবে স্রেফ গুন্ডামি। এটা কোনভাবেই; বরদাস্ত করা যায় না”।

কিন্তু তবু রক্ত ঝড়েছিল; কী হয়েছিল ২১শে জুলাই? পুলিশের গুলিতে ১৩ জন যুব কংগ্রেস ‘কর্মী’; নিহত হয়েছিলেন ময়দানে। ‘২১শে জুলাই’ বলতে সোজা কথায়; এমনটাই বলা হয়। কিন্তু কেন পুলিশ; গুলি চালাল? যারা মারা গিয়েছিলেন; তাঁরা কারা? সেদিন মমতা ব্যানার্জি, মদন মিত্র, সোনালি গুহদের; কাণ্ডকারখানা কেমন ছিল? মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর মমতা ব্যানার্জি; ওই ২১শে জুলাই নিয়ে কী করেছেন? এই প্রশ্নের উত্তরগুলি খুঁজলেই বোঝা যায়; কী হয়েছিল ১৯৯৩-র ২১শে জুলাই।

স্বরাষ্ট্রসচিব হিসাবে মণীশ গুপ্ত সেদিনের ঘটনার বিষয়ে; হাইকোর্টে ১৯৯৩-র ২রা আগস্ট একটি হলফনামা জমা দিয়েছিলেন। সেই হলফনামা অনুসারে, ওইদিন (১৯৯৩-র ২১শে জুলাই)-এ জমায়েতে; ‘বহু সশস্ত্র দুষ্কৃতী (অ্যান্টিসোস্যাল) নেশাগ্রস্ত অবস্থায় জড়ো হয়েছিল’। আশ্চর্য হল মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর সেই ঘটনার বিচারবিভাগীয় তদন্তের; নির্দেশ দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। কিন্তু আজও তৃণমূল জানে না; ওই ঘটনায় মৃত ১৩তম ব্যক্তিটি কে? তৃণমূলের ওয়েবসাইটে এখনও ওই ১৩ নম্বর জায়গার পাশে; লেখা আছে ‘অ্যানোনিমাস’। অর্থাৎ অজানা, কেন তাঁর পরিচয়; গোপন রাখেন মমতা ব্যানার্জি?

আরও পড়ুনঃ ইতিহাসে পড়ানো হয় না, আফগানদের পরাজিত করে ভারত ভূমি রক্ষা করেছিলেন নাগা সন্ন্যাসীরা

‘২১ শে জুলাইয়ের তদন্ত কমিশন’-র সরকারি ঘোষণা হয়েছিল; ২০১২-র ১৭ই ফেব্রুয়ারি। ২০১৪-র ডিসেম্বরে কমিশন; রিপোর্ট জমা দেয়। কমিশন সাক্ষ্য দিতে ডেকেছিল; বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে। কিন্তু যিনি সেই ‘অভিযান’-র উদ্যোক্তা; সেই মমতা ব্যানার্জিকে কমিশন ডাকেনি। কমিশন কেমন কাজ করেছে; তা এ থেকে কিছুটা বোঝা যায়।

তবু কমিশনের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুশান্ত চ্যাটার্জি; তাঁর তদন্ত রিপোর্ট জানাতে বাধ্য হয়েছেন যে; ১৩জনের মৃত্যু হয়েছিল সেদিন; তাদের মধ্যে একজনের গায়ে গুলির কোনও আঘাতই মেলেনি। সেই ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ; ‘সিরোসিস অব লিভার’। সাধারণত এই রোগটি; বেপরোয়া মদ্যপানের কারণে হয়। আর বেপরোয়া মদ্যপান; দুষ্কৃতীদের পরিচিত বৈশিষ্ট্য।

রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিব তখন ছিলেন মণীশ গুপ্ত; পরে তিনি হন মমতা সরকারের বিদ্যুৎমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রসচিব হিসাবে তিনি সেদিনের ঘটনার বিষয়ে; হাইকোর্টে একটি হলফনামা জমা দিয়েছিলেন। ১৯৯৩-র ২রা আগস্ট তাঁর জমা দেওয়া সেই হলফনামা অনুসারে; ওই দিন (১৯৯৩-র ২১শে জুলাই)-এ জমায়েতে; বহু সশস্ত্র দুষ্কৃতী (অ্যান্টিসোস্যাল) নেশাগ্রস্ত অবস্থায় জড়ো হয়েছিল।

ওই দিন সকাল সাড়ে ৯টা থেকে, সারা রাজ্যের কয়েক হাজার যুব কংগ্রেস কর্মী; স্ট্র্যান্ড রোড, বি বি গাঙ্গুলি স্ট্রিট, রানি রাসমণি অ্যাভিনিউ, এসপ্ল্যানেড রো ইস্ট এবং ব্রেবোর্ন রোডে জমায়েত হয়। মেয়ো রোডে, ধর্মতলায়, ব্রেবোর্ন রোডে, স্ট্র্যান্ড রোডে, বি বি গাঙ্গুলি স্ট্রিটে; হাজার হাজার মানুষের জমায়েত ছিল। যুব কংগ্রেস কর্মীরা; মহাকরণের দিকে ছুটতে থাকে। পুলিশ প্রথমে নেতাদের সঙ্গে কথা বলে; জনতাকে শান্ত করতে চেষ্টা করে।

আরও পড়ুনঃ দীর্ঘ ১২ বছর ধরে টালবাহানা, হাইকোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও শিক্ষক নিয়ােগ করেনি মালদা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদ

কিন্তু পুলিশের সেই চেষ্টা; ফলপ্রসূ হয়নি। ‘জনতা’ পুলিশকে লক্ষ্য করে; পাইপগান থেকে গুলি ছোঁড়ে। ইট, পাথর, সোডার বোতলও; ছোঁড়া হয় যথেচ্ছ। পুলিশ তখন লাঠি চালায়; ৩৪১ রাউন্ড কাঁদানে গ্যাসের শেলও ফাটায় পুলিশ। এবং রাইফেল থেকে ৭৫ রাউন্ড ও রিভলভার থেকে; ৪৬ রাউন্ড গুলি চালান হয়। সব মিলিয়ে জখম হয়েছিলেন; ২১৫ জনেরও বেশি পুলিশ। তাঁদের মধ্যে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার; যুগ্ম কমিশনার, ডি সি (সদর), ৭জন ডি সি; ১০ জন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার রয়েছে।

৩৪ জন পুলিশকে চিকিৎসার জন্য; নিয়ে যাওয়া হয় পুলিশ হাসপাতালে। তাঁদের অনেকেরই পাইপগানের গুলি; এবং বোমার স্প্লিন্টার লেগেছিল। তালতলা থানার সার্জেন্ট ডি কে ঘোষালের; গুলি লেগেছিল। এক সাব ইনস্পেক্টর কালাচাঁদ সমাদ্দারের শরীরে; আঘাত ছিল বোমার। কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সাব ইনস্পেক্টর এ কে গাঙ্গুলিকে; এসএসকেএম হাসপাতালের সামনে মেরে মাথা ফাটিয়ে; হাত ভেঙে দিয়েছিলো দুর্বৃত্তরা। আক্রান্ত, রক্তাক্ত হয়েছিল পুলিশ; তাই প্রাণ বাঁচাতে গুলি চালিয়েছিল।

আরও কী চক্রান্ত ছিল? সোনালি গুহর কথাই; শোনা যাক। সাতগাছিয়ার বিধায়ক সোনালি গুহ; তৃণমূলের মুখপত্র ‘জাগো বাংলা’-য় একটি ছোট প্রবন্ধ লিখেছিলেন তিনি ২০১২-তে। সোনালি গুহ দলীয় মুখপত্রের (বর্ষ -৮,সংখ্যা ৩৯০, সাপ্তাহিক) সংখ্যার তৃতীয় পৃষ্ঠায় লিখেছিলেন; ‘১৯ বছর আগের ২১শে জুলাই; দিনটি ছিল বুধবার। সকাল-সকাল আমরা; দিদির বাড়ি চলে এসেছিলাম। আগে থেকেই আমাদের কয়েকজন মেয়েকে; গোপনে একটা দায়িত্ব দেওয়া ছিল”।

কী সেই দায়িত্ব? একসময়ের বিধানসভার উপাধ্যক্ষা লিখছেন; “তা হল, জ্যোতি বসুর গাড়ি; আটকে দিতে হবে। আমরা তাই সটান চলে গেলাম; রেড রোডে। কারণ ওই রাস্তা দিয়েই; জ্যোতি বসুর কনভয় যাবে। মুসলিম মহিলাদের মতো বোরখা পরে; সেদিন ওই রাস্তায় গিয়ে আমরা অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু শ্যামলী ভদ্র (প্রয়াত প্রাক্তন কাউন্সিলর)-র; হাতের শাঁখা-পলা বেরিয়ে পড়ায় পুলিশ ধরে ফেলে”। পুলিশ সেদিন তাঁদের; সেখান থেকে সরিয়ে দেয়।

কিন্তু যা স্পষ্ট, তা হল; ১৯৯৩ সালের ২১শে জুলাই মহানগরের ফাঁকা রাস্তায়; তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর গাড়ি আটকানোর চক্রান্ত করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। তার জন্য রীতিমতো আগে থেকেই; ছক কষা হয়েছিল। এমনকি ছদ্মবেশেরও; সাহায্য নেওয়া হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি আটকে ঠিক কী করার ভাবনা ছিলো মমতা ব্যানার্জির; তা স্বাভাবিকভাবেই এড়িয়ে গেছেন সোনালি গুহ। যদি শুধু বিক্ষোভ দেখানোর ইচ্ছাও থাকত; তাহলে ছদ্মবেশ নেওয়ারও কোনো দরকার পড়ত না। এখানেই দানা বাঁধে সন্দেহ।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন