একাত্ম মানবতাদের জনক দীনদয়াল উপাধ্যায় ও মোগলসরাই স্টেশন

3309
একাত্ম মানবতাদের জনক দীনদয়াল উপাধ্যায় ও মোগলসরাই স্টেশন/The News বাংলা
একাত্ম মানবতাদের জনক দীনদয়াল উপাধ্যায় ও মোগলসরাই স্টেশন/The News বাংলা

দীনদয়াল উপাধ্যায় সংক্ষিপ্ত পরিচয়

পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের জন্ম; ১৯১৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তৎকালীন যুক্তপ্রদেশের মথুরা জেলার চন্দ্রভান গ্রামে৷ ১৯৩৭ সালে তিনি বিএ পাশ করেন৷ ওই বছরই তিনি আরএসএস–এ যোগ দেন; এবং এমএ পড়ার জন্য আগ্রায় যান৷ আরএসএস–এর কাজকর্মের সূত্রে; এখানেই তাঁর সাথে পরিচয় হয় নানাজি দেশমুখের৷ আরএসএস–এর পূর্ণাঙ্গ সময়ের কর্মী হিসাবে; তিনি ১৯৪২ সালে সংগঠনে যোগ দেন৷ জেলা সংগঠক হিসাবে তিনি উত্তরপ্রদেশের লখিমপুরে কাজ শুরু করেন৷

কষ্টময় শৈশব ও মেধাবী ছাত্রজীবন
দীনদয়াল উপাধ্যায়ের শৈশব; এক অতি সাধারণ উত্তর ভারতীয় নিম্ন মধ্যবিত্ত সনাতন হিন্দু পরিবেশে কেটেছে। ১৯৩৬ সালে ইন্টার মিডিয়েট পাশ করেন। সেই বৎসর বি.এ পড়ার জন্য কানপুর যান; সেখান থেকে বি.এ. পাশ করে; এম.এ. পড়ার জন্য আগ্রা যান। সেখানে রাজমণ্ডীতে বাড়ী ভাড়া নিয়ে থাকেন। ১৯৪১ সালে; ২৫ বছর বয়সে বি.টি করার জন্য প্রয়াগ চলে যান। এরপরেই তাঁর জীবন সার্বজনিক হয়ে পড়ে। তিনি অখণ্ড প্রবাসী হয়ে যান।২৫ বৎসর বয়স পর্যন্ত; দীনদয়াল উপাধ্যায় রাজস্থান ও উত্তর প্রদেশের ১১টি স্থানে কিছু কিছু সময় ঘুরে ঘুরে কাটিয়েছেন। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট তিনি; ‘রাষ্ট্র ধর্ম’ নামে মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন৷ তারপর প্রকাশ করেন সপ্তাহিক পত্রিকা ‘পাঞ্চজন্য’ এবং শেষে ‘দৈনিক স্বদেশ’৷

১৯৫১ সালের ২১ অক্টোবর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর নেতৃত্বে জন্ম নেয়; ‘ভারতীয় জনসংঘ’৷ পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় এই দলের উত্তরপ্রদেশ শাখার সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন; এবং তারপর সর্বভারতীয় সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন৷ ১৯৫৩ সালে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলে সংগঠনের দায়িত্ব এসে পড়ে পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের কাঁধে৷ ১৫ বছর তিনি এই দায়িত্ব পালন করেছেন৷ ১৯৬৮ সালে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন৷

তবে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ না নেওয়ায়; সারাজীবন সমালোচনা সহ্য করতে হয় তাঁকে।ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এই দিনগুলোতে; তরুণ দীনদয়াল কী ভূমিকা পালন করেছিলেন? তিনি কি স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন? না; তেমন কোনও ভূমিকা পালন করতে তাঁকে দেখা যায়নি৷ দেখা যায়নি কারণ; দীনদয়ালজি ও তাঁর সংগঠন আরএসএস মনে করত; ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করা উচিত নয়৷ এই কারণে তাঁরা ১৯৪০–’৪১–এর ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহ; ভারত ছাড়ো আন্দোলন; আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচার এবং বোম্বাইয়ের নৌ বিদ্রোহকে ঘিরে ১৯৪৫–’৪৬–এর আন্দোলন সব কিছু থেকেই; সচেতন ভাবে দূরে থেকেছেন৷ চেষ্টা করেছেন দেশের তরুণদের এই সংগ্রাম থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে৷

দীনদয়ালজি ছিলেন; আরএসএস–এর একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রচারক৷ তিনি তো আরএসএস–এর এই চিন্তা; এই মতবাদই প্রচার করেছিলেন তিনি প্রচার করেছিলেন; ব্রিটিশের বিরোধিতা নয়; ব্রিটিশের সাথে সহযোগিতা করা দরকার এবং এটাই ভারতবাসীর একমাত্র কর্তব্য৷ এই কাজ তিনি এত দক্ষতা ও যোগ্যতার সাথে করেছিলেন যে; দ্রুত সংগঠনে তাঁর পদোন্নতি হয়েছিল৷ ১৯৪২ সালে একজন সাধারণ প্রচারক থেকে; ১৯৪৭ সালে তিনি সংঘের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত হয়েছিলেন৷ ফলে দীনদয়ালজি শুধু স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেননি তাই নয়; আরএসএস–এর ঐতিহ্য অনুযায়ী, আরএসএস–এর অন্যান্য নেতাদের মতোই তিনিও ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিলেন৷

সব থেকে বড় কথা হল; এই জন্য তাঁর কোনও আত্মগ্লানি ছিল না৷ ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ না দেওয়াকে; যুক্তিসঙ্গত প্রতিপন্ন করতে গিয়ে দীনদয়ালজি বলছেন; ‘এই ভ্রান্ত ধারণাই আমাদের মনকে  আচ্ছন্ন করে আছে যে; বিদেশি শাসককে উচ্ছেদ করার মধ্যেই আমাদের স্বাধীনতা নিহিত৷ বিদেশি শাসনের বিরোধিতা মানে এই নয় যে; আমরা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক৷ স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে ব্রিটিশ বিরোধিতার উপরই বড় বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল৷ ভাবা হত যারাই ব্রিটিশের বিরোধিতা করছে; তারাই দেশপ্রেমিক৷ ব্রিটিশের বিরুদ্ধে অসন্তোষ সৃষ্টির জন্য নিয়মিত প্রচার চালানো হত৷ বলা হত দেশের সমস্ত দুঃখ–দারিদ্র–যন্ত্রণার জন্য ব্রিটিশরাই দায়ী’৷

হিন্দু–মুসলিম ঐক্য প্রসঙ্গে
ব্রিটিশ শাসকদের বন্ধুর ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন এটা পরিষ্কার; কিন্তু তা বলে কি তাঁরা সেই সময় চুপচাপ বসেছিলেন? না; এই অপবাদ দীনদয়ালজিদের দেওয়া যাবে না৷ তাঁরা মুসলমানদের কল্পিত অধীনতা থেকে; হিন্দুদের মুক্ত করার জন্য প্রাণপণ প্রচার চালিয়েছিলেন৷ মুসলমানদের হুঁশিয়ারি দিয়ে গোলওয়ালকর সেই সময় বলেছিলেন; ‘হিন্দুস্তানের অ–হিন্দু জনগণকে হয় হিন্দু সংস্কৃতি ও ভাষা গ্রহণ করতে হবে; হিন্দু ধর্মকে শ্রদ্ধা ও ভক্তি করতে শিখতে হবে; হিন্দু জাতি এবং সংস্কৃতির প্রচার ব্যতীত অন্য কোনও ধারণা বর্জন করতে হবে। এক কথায়; তাদের হয় বিদেশি হয়ে থাকা বন্ধ করতে হবে অথবা তারা এ দেশে থাকতে পারে; কিন্তু সম্পূর্ণভাবে হিন্দু জাতির অধীনস্থ হয়ে। কোনও কিছু দাবি না করে; কোনও বিশেষ সুবিধার দাবিদার না হয়ে তো বটেই– এমনকী নাগরিক অধিকারের দাবিদার না হয়ে৷’ (উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইন্ড, পৃঃ৫৫–৫৬)৷

দীনদয়ালজির অভিমতও ছিল একই রকম৷ গোলওয়ালকরের মতো তাঁর মনোভাবও ছিল মুসলিম বিদ্বেষী চিন্তায় ভর্তি৷ এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন; ‘‘মুসলিম সম্প্রদায়ের দেশবিরোধী  বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব অখণ্ড ভারত গড়ে তোলার পথে সবচেয়ে বড় বাধা। অখণ্ড ভারত সম্পর্কে যাদের সন্দেহ আছে; তারা মনে করে মুসলমানরা এই মনোভাব পরিবর্তন করবে না৷ তাই যদি হয়; তবে ভারতে ছয় কোটি মুসলমানের অবস্থান; ভারতের স্বার্থের পক্ষে খুবই  ক্ষতিকারক হবে৷’’ (সুধাকর রাজে সম্পাদিত পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় গ্রন্থ থেকে)৷ দীনদয়ালজি আরও বলেছেন; ‘‘ভারতের স্বাধীনতার পর; জনগণ; রাজনৈতিক দলগুলো এবং সরকার অনেক  গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার  মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু মুসলিম সমস্যা হল সবচেয়ে পুরনো; সবচেয়ে জটিল৷ এই সমস্যা প্রতিদিন নতুন নতুন রূপ ধারণ করছে৷ বিগত বারোশো বছর ধরে; আমরা এই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি৷’’ (বি এন জোগ, পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় : ইডিওলজি অ্যান্ড পারসেপশন–পলিটিকস ফর নেশনস সেক)৷

কিন্তু পণ্ডিত দীনদয়াল হেঁটেছেন একেবারে উল্টোপথে৷ তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেননি; লড়াই করেছেন ইংরেজি ভাষার বিরুদ্ধে৷ বুক ফুলিয়ে বলেছেন; ‘‘ইংরেজি ভাষা তাড়াতে পারলে; আমাদের জাতীয় মর্যাদা রক্ষিত হবে৷’’ বলেছেন; ‘‘যদি ইংরেজি ভাষা থেকে যায়; তা হলে কোনও ভারতীয় ভাষাই বিকশিত হবে না৷’’  ব্যাপারটা বুঝুন; ভাষা বিকাশের বিজ্ঞানের তিনি কোনও তোয়াক্কাই করলেন না; ইংরেজি বিদায়ের সাথে সাথে তো বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ প্রায় ছিন্ন হয়ে যাবে; আর তার ফলে তো ভারতীয় ভাষাগুলোর বিকাশ এবং সেই অর্থে হিন্দি ভাষা বিকাশের  প্রক্রিয়াও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে তা হলে? দীনদয়ালজির কথা হল; বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারের সাথে আমাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয় হোক;  কিন্তু ইংরেজি ভাষাকে তাড়াতে হবে৷

চমকে উঠবেন না; দীনদয়ালজি সত্যিই এমন কথা বলেছেন তাঁর ভাষায়, ‘‘ইভেন অ্যাট দ্য রিস্ক্ অফ লুজিং অ্যাক্সেস টু মডার্ন সায়েন্টিফিক নলেজ; উই শুড ফ্রি আওয়ারসেলভস ফ্রম দ্য ক্লাচেস অফ দিজ ফরেন টাং৷’’ অর্থাৎ, আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সাথে সংযোগ হারানোর বিপদ থাকলেও এই বিদেশি ভাষার খপ্পর থেকে আমাদের নিজেদের মুক্ত করা উচিত৷ (উপরের উদ্ধৃতিগুলো সুধাকর রাজে সম্পাদিত ‘পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়, এ প্রোফাইল’ গ্রন্থ থেকে গৃহীত)৷

কোথাও অস্পষ্টতা নেই; নাই বা রইল বিজ্ঞান; নাই বা রইল আধুনিক জ্ঞান– সনাতন ধর্ম থাকবে তো’ রাম নাম সত্য হ্যায়’ বলতে বলতে কিশোরী বধূকে স্বামীর সাথে চিতায় তুলে পুড়িয়ে মারা যাবে তো এ হলেই তো চলে যাবে৷ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ঝামেলার দরকার কী? সবমিলিয়ে দীনদয়ালজির ‘মহামানব’ ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছে বিজেপি। সেই সময়কার মোগলসরাই এবং অধুনা পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় জংশনে রহস্যজনকভাবে তাঁর মৃতদেহ পাওয়া যায়। সেই রহস্যের আজও সমাধান হয় নি।

ReplyForward
Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন