পরাধীন ভারতে মাঠের বাইরে, ব্রিটিশদের বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়েছিল ইস্টবেঙ্গল

1496
পরাধীন ভারতে মাঠের বাইরে, ব্রিটিশদের বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়েছিল ইস্টবেঙ্গল/The News বাংলা
পরাধীন ভারতে মাঠের বাইরে, ব্রিটিশদের বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়েছিল ইস্টবেঙ্গল/The News বাংলা

পরাধীন ভারতে বিদ্রোহের অনেক ঘটনাই; ইতিহাসের পাতায় সেভাবে ঠাই পায়নি। আমরা জানিও না সেভাবে। যেমন খুব কম মানুষ জানেন; পরাধীন ভারতে মাঠের বাইরে; ব্রিটিশদের বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়েছিল ইস্টবেঙ্গল। ব্রিটিশ বর্ণবৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে; কলকাতার ফুটবল ময়দানে; বিপ্লবের নতুন ইতিহাস লিখেছিল ইস্টবেঙ্গল। ১৯২৫ সালে কলকাতা ফুটবলে; দ্বিতীয় থেকে প্রথম ডিভিশনে উন্নীত হয় ইস্টবেঙ্গল। মনে করা হয়, কলকাতা ফুটবলের রংই পাল্টে দিয়েছিল এই উত্তরণ। কিন্তু এই পরিবর্তন মোটেই সহজে আসেনি। প্রবল লড়াই করেই প্রথম ডিভিশনে; খেলার ছাড়পত্র পেতে হয়েছিল লাল-হলুদকে। আর এর পিছনে ছিল; ব্রিটিশদের বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে; মাঠের বাইরে ইস্টবেঙ্গল এর অদম্য লড়াই।

আর এই লড়াইয়ের পরে তৎকালীন আইএফএ কর্তাত, বাধ্য হয়েছিল; ব্রিটিশদের নিয়ম পাল্টে, লাল-হলুদ-কে কলকাতা ফুটবলের দ্বিতীয় থেকে প্রথম ডিভিশনে তুলতে। মাঠের বাইরের নোংরা রাজনীতি; ও ব্রিটিশদের বর্ণবৈষম্যের সামনে মাথা নত করেনি ইস্টবেঙ্গল। সেই যুদ্ধেও, ব্রিটিশদের হারিয়ে; শেষ পর্যন্ত জয়ী হয় ইস্টবেঙ্গল।

আরও পড়ুনঃ কৃষ্ণদাস পালের বিস্কফার্ম বুঝিয়ে দিয়েছে, বাঙালিও ব্যবসা শেখাতে পারে

কি ছিল কলকাতা ফুটবলে ব্রিটিশদের বর্ণবিদ্বেষী নীতিঃ ১৯১১ সালে মোহনবাগানের সেই ঐতিহাসিক শিল্ড বিজয়ের পরেও; কলকাতা ফুটবলের প্রথম ডিভিশনের দরজা; ভারতীয় ক্লাবগুলির জন্য খোলা ছিল না। শুধুমাত্র, মোহনবাগান এবং এরিয়ান; প্রথম ডিভিশন ক্লাবের মর্যাদা উপভোগ করতে থাকে। বাকি সব দলই ছিল ইউরোপীয় বা মিলিটারি দল। ১৯২৪ সালে কলকাতা ফুটবল লিগের দ্বিতীয় ডিভিশনে; ইস্টবেঙ্গল এবং ক্যামেরন ‘বি’ দু’দলই, প্রথম স্থানে শেষ করল ৩৭ পয়েন্ট নিয়ে। ক্যামেরন ‘বি’ ছিল ব্রিটিশ রেজিমেন্টাল দল। তাদের অন্য একটি দল; ইতিমধ্যেই প্রথম ডিভিশনে খেলছিল। তাই নতুন করে আর তাদের; প্রথম ডিভিশনে উন্নীত হওয়ার ব্যাপার ছিল না। তারা নিজেদের অংশগ্রহণ প্রত্যাহারও করে নিল। কিন্তু ইস্টবেঙ্গল শুরু করে লড়াই।

তখন, ইস্টবেঙ্গল জোরালো ভাবে তাদের দাবি জানাতে থাকে; প্রথম ডিভিশন খেলার জন্য। ইস্টবেঙ্গলের প্রেসিডেন্ট তখন; সন্তোষের মহারাজা মন্মথনাথ রায়চৌধুরি। তাঁর নেতৃত্বেই ইস্টবেঙ্গল; দু’টি দাবি জানিয়ে চিঠি দেয়। যা যুগান্তকারী চিঠি হিসেবেই থেকে গিয়েছে; ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে। ইস্টবেঙ্গলের দাবি ছিল; এক) কলকাতা ফুটবল থেকে; বর্ণবৈষম্যকে দূর করতে হবে। শ্বেতাঙ্গ বলে তাদের টিমই; শুধু খেলার সুযোগ পাবে, এমন নিয়ম রাখা চলবে না। দুই) দ্বিতীয় ডিভিশনে এক নম্বর স্থানে শেষ করা ইস্টবেঙ্গলকেই; যোগ্য দল হিসাবে প্রথম ডিভিশনে খেলতে দিতে হবে।

আরও পড়ুনঃ দেশের জন্য ১৮ বছর জেল খেটেও, স্বাধীন ভারতে লরির খালাসির কাজ করেছেন বর্ধমানের বিপ্লবী বটুকেশ্বর

পরাধীন ভারতে, ইস্টবেঙ্গলের এই জোড়া চিঠি নিয়ে; আইএফএ বৈঠকে ঝড় বয়ে যায়। ব্রিটিশদের পাশাপাশি, কমিটিতে থাকা অনেক ভারতীয় ক্লাবই; ইস্টবেঙ্গলের বিরোধিতা করতে শুরু করে। কয়েকটি ইউরোপীয় ক্লাব বরং; ইস্টবেঙ্গলের পাশে দাঁড়িয়েছিল। এমনকি, এত দূর জল গড়ায় যে; ইউরোপের অনেক ক্লাব হুমকি দেয়; ভারতীয় দলগুলি খেললে; প্রথম ডিভিশন থেকে তারা নাম প্রত্যাহার করে নেবে। শেষ পর্যন্ত, চাপে পড়ে আইএফএ ইস্টবেঙ্গল এর দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। বহুবছরের বর্ণবৈষম্যমূলক আইনের অবলুপ্তি ঘটে; এবং ইস্টবেঙ্গলও প্রথম ডিভিশনে খেলার ছাড়পত্র পায়। ইস্টবেঙ্গলের হাত ধরে, শুরু হয়; কলকাতা ফুটবলের এক নতুন অধ্যায়।

ভারত দুই টুকরো হওয়ার আগে; ফুটবল সংস্থা চালাতেন ইংরেজরা। ক্লার তৈরির ১০ বছর পর; ১৯৩০ সালে, ফের অনেকটা এই একই ইস্যুতে; ইংরেজ ফুটবল কর্তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ জানানোর জন্য; এক সন্ধ্যায় কর্তা ও সমর্থকেরা ময়দানের তাঁবু থেকে মিছিল করে; আইএফএ অফিস পর্যন্ত গিয়েছিলেন। তখন তাঁদের হাতে ছিল জ্বলন্ত মশাল। সেটাই পরে অর্থবহ হয়ে দাঁড়ায়। যেন প্রতিবাদের প্রতীক। পরে এই জ্বলন্ত মশাল; হয় ইস্টবেঙ্গলের প্রতীক। এই প্রতিবাদী চরিত্রটাই; ইস্টবেঙ্গলের আসল শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। যার জন্য ১০০ বছর পরেও; বিদেশি ক্লাবদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে; ভারতের একনম্বর ফুটবল ক্লাবের নাম এখনও সেই ইস্টবেঙ্গল।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন