বাড়িতে বসে ঈদ পালন হলে, পাড়ায় বসে দুর্গা পুজো কেন হবে না, আসল কারণটা ঠিক কি

488
বাড়িতে বসে ঈদ পালন হলে, পাড়ায় বসে দুর্গা পুজো কেন হবে না, কারণ টা ঠিক কি
বাড়িতে বসে ঈদ পালন হলে, পাড়ায় বসে দুর্গা পুজো কেন হবে না, কারণ টা ঠিক কি

মানব গুহ, কলকাতাঃ “করোনা পরিস্থিতিতে; এবছর বাড়িতে বসেই ঈদ পালন করুন”; বক্তা ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। “করোনাকে লকডাউন করে; রাস্তায় নেমে ঠাকুর দেখুন। বাড়িতে বসে কি দুর্গা পুজো হয়”; বক্তা সেই একই। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাড়িতে বসে ঈদ পালন হলে; পাড়ায় বসে দুর্গা পুজো কেন হবে না? সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ মানুষ। শুধু বাংলার ঈদ বা মহরম বা দোল উৎসব নয়; মহারাষ্ট্রে গণেশ পুজো; ওড়িশায় রথ যাত্রা সহ ভারতের সব রাজ্যেই; সব উৎসব এবার বন্ধ করা হয়েছে; করোনা আবহকে মাথায় রেখে। তাহলে বাংলার দুর্গা পুজো ব্যতিক্রম হবে কেন? প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।

করোনা পরিস্থিতিকে সামনে রেখে; মুসলিম মানুষদের কাছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হাত জড়ো করে আবেদন করেছিলেন; “ঈদের নমাজের জন্য কোনও জমায়েত করা সম্ভব নয় ৷ তাই বাড়িতে থেকেই সবাইকে ঈদের প্রার্থনা করার অনুরোধ করছি”। মুখ্যমন্ত্রীর আর্জি মেনে নিয়েছিলেন; রাজ্যের মুসলিম ধর্মের মানুষ। মমতাকে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন; বাংলার আমজনতা। মমতার নিষেধ মেনে; পয়লা বৈশাখ থেকে চড়ক কোনও অনুষ্ঠানেই; বাড়ির বাইরে কেউই বেরোতে পারেননি।

আরও পড়ুনঃ পুজো মণ্ডপে দর্শক ঢোকার অনুমতি পেতে, কলকাতা হাইকোর্টে রিভিউ পিটিশন দায়ের ফোরাম ফর দুর্গোৎসবের

ঈদের সময় রাজ্যে যা সংক্রমণ ছিল; এখন তা আরও অনেক বেড়েছে। এখন দিনে ৪ হাজার মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন; করোনা ভাইরাসে। সম্প্রতি মমতার মিছিল; বিজেপির নবান্ন অভিযান; টিটাগড়ে তৃণমূল বিজেপির মিছিলের পর; কলকাতা ও উত্তর ২৪ পরগনায় করোনার প্রকোপ বেড়েছে। পুজোর বাজারে কেনাকেটার ভিড়; করোনা বাড়িয়েছে বর্ধমান সহ বিভিন্ন জেলায়। তারপরেও, মুখ্যমন্ত্রী তৃতীয়ার রাত থেকেই; মানুষকে রাস্তায় নেমে, ঠাকুর দেখার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন।

কিন্তু কেন? বিরোধী দলের নেতারা, বেশ কিছু পুজো উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষ বলছেন; পুজোকে কেন্দ্র করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের; একটা বিশাল প্রচার হয়। বিভিন্ন পুজো কমিটির উদ্যোগে গোটা কলকাতা সহ; গোটা রাজ্যের প্রায় সব জেলার রাস্তাতেই মমতার কাটআউটে ভরে যায়। ইতিমধ্যেই, কলকাতা ভরে গেছে; মমতার বিশাল বিশাল কাটআউটে। উত্তর থেকে দক্ষিণ; বেশ কিছু পুজো উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও কলকাতার দুর্গা পুজো সংগঠন, ফোরাম ফর দুর্গোৎসবের উদ্যোগে; পাড়ায় পাড়ায়, রাস্তায় রাস্তায় মমতার প্রচার ও গুণগান।

মানুষ রাস্তায় না নামলে; সেই প্রচার বৃথা যাবে; বলছেন বিরোধী নেতা থেকে সাধারণ মানুষ অনেকেই। মমতা জানেন, মুসলিম ভোট ব্যাঙ্ক; তৃণমূলেই আছে। কিন্তু লোকসভা ভোটে যে হিন্দু ভোট ব্যাঙ্ক; বিজেপির দিকে ঘুরে গেছে; সেটা ফিরিয়ে আনতে, হিন্দুত্বের ধ্বজা তুলে ধরতেই; যেন তেন প্রকারেণ দুর্গা পুজো স্বাভাবিক করতেই হবে। এমনটাই বলছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। পুজো নয়; আসল কথা ভোটের প্রচার; বলছে বাংলার রাজনৈতিক মহল। তবে, এই তথ্য উড়িয়ে দিয়েছে; তৃণমূল নেতারা।

আরও পড়ুনঃ সব পুজো প্যান্ডেলই ‘নো এন্ট্রি জোন’, জনস্বার্থ মামলায় রায় দিল কলকাতা হাইকোর্ট

তবে, অনেক পুজো উদ্যোক্তাই এর সঙ্গে একমত নন। পুজো উদ্যোক্তাদের বক্তব্য; দুর্গা পুজো শুধু বাংলার আবেগ নয়; এর সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার মানুষের রুটি রুজি। তাই, দর্শক ছাড়া পুজো সম্ভব নয়। তবে, এর উত্তরে অনেকেই বলেছেন; বাংলার দুর্গা পুজোর মতই ছিল মহারাষ্ট্রে গণেশ পুজো। করোনার কারণে সেটা বন্ধ ছিল। অন্যদিকে, ভালো অবস্থায় থাকা কেরলে; ওনাম উৎসবের পর, করোনা ব্যপক আকার নিয়েছে। আর সুপ্রিম কোর্ট, এবার কোন উৎসবের অনুমতি দেয় নি। তাহলে বাংলার দুর্গা পুজো কি ব্যতিক্রম!

লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ অসহায়; লোকাল ট্রেন না চলায়। কেন্দ্র অনুমতি দিলেও; অনুমতি দেন নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলার কোটি কোটি মানুষের অসুবিধা হচ্ছে। কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে, অনেকেই বলছেন; সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। লোকাল ট্রেন চললে; আর করোনাকে ধরে রাখা যাবে না। তাহলে, শুধু দুর্গা পুজোর বেলায়; কেন জেদ মমতার। ইতিমধ্যেই, শ্রী ভূমির পুজো প্যান্ড্যালে মানুষের ভিড় দেখে; চমকে উঠেছেন চিকিৎসকরা। যারা ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীকে; পুজোর উৎসব নিয়ে সাবধান করে চিঠি দিয়েছেন।

কেরালার ওনামের উদাহরণ দিয়ে; মমতাকে সাবধান করেছেন দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রী হর্ষবর্ধন। শুধু তাই নয়, মমতার নিজের স্বাস্থ্য দফতরের করা রিপোর্টেও; উঠে এসেছে ভয়ঙ্কর তথ্য। রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের করা রিপোর্ট, দেখেই মাথায় হাত; রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের কর্তাদের। পুজোর মরসুমে মানুষ সতর্ক না থাকলে; করোনা মহামারী ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলেই; রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের আশঙ্কা।

আরও পড়ুনঃ বাংলার বাড়ছে করোনা পজিটিভ রেট, ঘুম উড়েছে স্বাস্থ্য কর্তাদের, পুজো উদ্বোধনে মুখ্যমন্ত্রী

স্বাস্থ্য দফতরের রিপোর্টে প্রকাশ, মার্চ থেকে আগস্ট মাসে; রাজ্যে করোনা ভাইরাস; বেশ কিছুটা নিয়ন্ত্রণেই ছিল। কোভিড হাসপাতালের; বেড খালি ছিল। বাস্তব চিত্র যাচাই করতে, গোটা সেপ্টেম্বর জুড়ে কলকাতা, দার্জিলিং সহ; পাঁচটি জেলার সাত হাজার মানুষের; লালারস বা নাসিকা নিঃসৃত রস পরীক্ষা হয়। পরীক্ষা হয় স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনে। আবার নাইসেডও নিজের মতো করে; সমীক্ষা চালায়। আর সেই রিপোর্টে দেখে; ঘুম ছুটেছে রাজ্য স্বাস্থ্য কর্তাদের।

রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের প্রধান সচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম জানিয়েছেন; “মাত্র একমাসের ব্যবধানে; পজিটিভ রেট ২.২ শতাংশ বেড়েছে। আগস্টে ছিল ৬.৯০ শতাংশ; এখন ৮.৪৮ শতাংশ”। স্বাস্থ্যসচিবের কথায়; “করোনা সংক্রমণ রুখতে, পুজোর উৎসব থেকেই অর্থাৎ অক্টোবর মাস থেকে; ২০২১ এর মার্চ পর্যন্ত; টানা ছয় মাস বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে”।

একদিকে, বাংলায় বাড়ছে করোনা পজিটিভ রেট; ঘুম উড়েছে স্বাস্থ্য কর্তাদের; অন্যদিকে একের পর এক পুজো উদ্বোধনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ক্রমাগত উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন মানুষকে; বাড়ির বাইরে বেড়িয়ে রাস্তায় নেমে ঠাকুর দেখতে। সবটাই কি পুজোর আবেগকে কাজে লাগিয়ে; পুরভোট ও বিধানসভা ভোটের আগে; নিজের প্রচার দেখাতে? আর এতেই কি সঙ্গ দিচ্ছেন; পুজো উদ্যোক্তাদের নামের আড়ালে থাকা; কিছু স্বার্থপর তৃণমূল নেতা ও সমর্থক? উঠে গেছে প্রশ্ন।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন