কিভাবে বাংলার বন বাঁচাবে সরকার

786
কিভাবে বাংলার বন বাঁচাবে সরকার/The News বাংলা
কিভাবে বাংলার বন বাঁচাবে সরকার/The News বাংলা

সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে; ব্যপক ক্ষতি হয়েছে সুন্দরবনের ম্যোনগ্রোভ অরণ্যের। সেই ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনা করে অরণ্য বাঁচানোর পরিকল্পনা তৈরি করতে; কমিটি গড়েছে রাজ্য সরকার। এই তত্পরতার মধ্যেই নতুন তথ্য সামনে এসে; সুন্দরবন বাঁচাতে সরকারের প্রচেষ্টা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।কারণ শুধু একটা ঝড়ের কারণে নয় ; বছরের পর বছর ধরে সুন্দরবনের অরণ্যভূমি তিলে তিলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে বলে সমীক্ষা রিপোর্টে উঠে এসেছে। বুলবুলের তাণ্ডবের পর; প্রশাসন নতুন করে ম্যানগ্রোভের গুরুত্ব বোঝার ইঙ্গিত দিলেও; ইতিমধ্যেই অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছে কিনা; তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অরণ্য বিশেষজ্ঞরা।

সুন্দরবন সহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব  অরণ্যভূমির অবস্থা জানাতে;  দু’বছর অন্তর সমীক্ষা করে কেন্দ্রীয় সরকার। যাকে বলা হয়  ফরেস্ট সেন্সাস। ইন্ডিয়ান স্টেট অব ফরেস্ট রিপোর্ট এই ফরেস্ট সেন্সাসের দায়িত্বে থাকে। ২০১৯ সালে; এরকম একটি সমীক্ষা করা হয়েছিল। যার রিপোর্ট  সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে।

রিপোর্টটি রাজ্যের বন দপ্তরেও পৌঁছেছে। সেই রিপোর্টে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী; গত আট বছরে ৪৩ বর্গ কিমি ম্যানগ্রোভ অরণ্য বা বাদাবন হারিয়ে গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। এর মধ্যে প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোধে সবচেয়ে কার্যকর; ‘অতি গভীর ম্যানগ্রোভ’ এলাকা কমেছে ৪২ বর্গ কিমি। ২০১১-র সমীক্ষায় সুন্দরবনে বাদাবনের এলাকা ছিল ২১৫৫ বর্গ কিমি। ২০১৯-র সমীক্ষায় নেমে এসেছে ২১১২.১১ বর্গ কিমিতে। ১৯৮৭-র পর লাগাতার রাজ্যে ম্যানগ্রোভের পরিমাণ বেড়েছিল। ১৯৮৭-তে ছিল ২০৭৬ বর্গ কিমি। কিন্তু গত সাত-আট বছর ধরে; তা কমার দিকে। চরিত্র ও ঘণত্ব অনুযায়ী ম্যানগ্রোভ অরণ্যকে তিন ভাগে ভাগ করা হয় হয়; ‘অতি গভীর বাদাবন’, ‘গভীর বাদাবন’ এবং ‘ওপেন ম্যানগ্রোভ জোন’।

সাইক্লোনের মত প্রাকৃতিক বিপর্যয় এড়াতে; প্রথম দুই শ্রেণির ম্যানগ্রোভ অরণ্য সবথেকে কার্যকরী ।পশ্চিমবঙ্গে এই দুই ধরণের ম্যানগ্রোভই; আশঙ্কাজনক ভাবে কমেছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ। বন দপ্তরের এক আধিকারিকের কথায়; “খুব গভীর, মাঝারি গভীর ম্যানগ্রোভ কমছে। স্বাভাবিকভাবেই সেই এলাকা পরিণত হচ্ছে ওপেন এরিয়ায়। তা বাড়ছে। যা আসলে বিপদের বার্তা দিচ্ছে”।

কেন মরছে বাদাবন?  উপকূল সংলগ্ন জনপদে লাগামছাড়া নির্মাণ; বর্জ্য নিষ্কাশন; নদীতে এন্তার জ্বালানি তেল ছড়ানোর মতো কাজগুলিই; ক্রমশ বাদাবনের বিস্তীর্ণ এলাকা ফাঁকা করে দিচ্ছে বলে অরণ্য বিশেষজ্ঞজের অভিমত। অন্য কারণটি অবশ্যই আর্থ-সামাজিক। সুন্দরবনের বাদাবন সংলগ্ন দ্বীপাঞ্চলগুলিতে জনসংখ্যা লাগাতার বাড়ছে। কাজের অভাব; সরকারের নির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব; গ্রামবাসীদের আরও বেশি করে অরণ্য নির্ভর করে তুলছে। তার প্রভাব পড়ছে জঙ্গলের বাস্তুতন্ত্রে। ২০১১-তে অতি গভীর ম্যানগ্রোভ ছিল ১০৩৮ বর্গ কিমি। ২০১৯-এ তা কমে হয়েছে ৯৯৫.৬২ বর্গ কিমি। মাঝারি ম্যানগ্রোভ এলাকা রাজ্যে ২০১১-তে ছিল ৮৮১ বর্গ কিমি।

২০১৯-এ তা নেমে এসেছে ৬৯২ বর্গ কিমি এলাকায়। খোলা ম্যানগ্রোভ এলাকা ২০১১-তে ছিল ২৩৬ বর্গ কিমি এলাকা। তা ২০১৯-এ হয়েছে ৪১৯.৫০ বর্গ কিমি। রাজ্যের তিনটি জেলায় ম্যানগ্রোভের অস্তিত্ব আছে— দক্ষিণ ২৪ পরগনা, উত্তর ২৪ পরগনা এবং পূর্ব মেদিনীপুর। কিন্তু সর্বশেষ সমীক্ষায় স্পষ্ট, পূর্ব মেদিনীপুরের উপকূল থেকে ম্যানগ্রোভ বিলুপ্ত হতে বসেছে। বাদাবন রয়েছে বাকি দুই ২৪ পরগনার সুন্দরবন এলাকায়। তার মধ্যে দক্ষিণ ২৪ পরগনাই প্রধান। এখানে ২০১১-তে মোট ম্যানগ্রোভ এলাকা ছিল ২১১৮ বর্গ কিমি। তা নেমে এসেছে ২০৮২.১৭ বর্গ কিমিতে।।উত্তর ২৪ পরগনাতেও কমেছে বাদাবন।

এই জেলায় খুব গভীর বাদাবন আট বছরে ২০ বর্গ কিমি থেকে নেমে এসেছে ১২.৯৭ বর্গ কিমিতে। মাঝারি গভীর বাদাবন বেড়েছে ৪ বর্গ কিমি। বেড়েছে খোলা এলাকাও।এই সমীক্ষায় অশনি সংকেত দেখছেন পরিবেশ বিদরা। তাদের  মতে এভাবে ম্যানগ্রোভ প্রাচীর নষ্ট হলে আগামী দিনে বুলবুলের মতো সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় থেকে রাজ্যের আর কোন রক্ষা কবচ থাকবে না।শুধু লোক দেখানো তত্পরতা নয়, সুন্দরবন বাঁচাতে সরকারের যথার্থ আন্তরিক হয়ে পদক্ষেপ করতে হবে বলে তাঁরা মনে করছেন।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন