ভোট আর বন্যায় মনে পরে ‘ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান’, স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলার ‘কুমিরছানা’

1242
ভোট আর বন্যায় মনে পরে ‘ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান’, স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলার 'কুমিরছানা'
ভোট আর বন্যায় মনে পরে ‘ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান’, স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলার 'কুমিরছানা'

ভোট আর বন্যায় মনে পরে; ‘ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান’। স্বাধীনতার পর থেকেই; বাংলার ‘কুমিরছানা’। ভোট আসতেই চর্চায় আসে; ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান। ভোট আসে, ভোট যায়; কিন্তু ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের রূপায়ণ আর হয় না। আবার মনে পরে; বন্যায় ভেসে যাবার পর। ঠিক যেমন এখন। দুদিনের বৃষ্টিতেই জলে ভাসছে; বানভাসি ঘাটালের মানুষ। বছরের পর বছর, ‘ঘাটাল মাস্টার প্লান হবে; মানুষের সমস্যা দূর হবে’; শুনে আসছে ঘাটালবাসি। কাজের কাজ; গত ৭৫ বছরেও হয়নি। কেউ বলেন ‘কুমিরছানা’; কেউ বলেন ‘দিল্লিকা লাড্ডু’। স্বাধীনতার পরে যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল; তা আজও রুপায়ন হয়নি।

ঘাটালে বন্যার কারণটা ভৌগোলিক। ছোটনাগপুর মালভূমি থেকে উৎপন্ন হওয়া শিলাবতী; কংসাবতী; দ্বারকেশ্বর-সহ কয়েকটি নদীর ভূমি ঢাল; দীর্ঘপথ অতিক্রম করে ঘাটালের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীগর্ভে পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায়; বৃষ্টি হলেই নদীগুলির দুপাশের লোকালয় হিসেবে ঘাটাল মহকুমার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। নষ্ট হয়ে যায় চাষের জমি; বাড়িঘর, রাস্তা।

এই এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার দাবিতে; প্রথম সরব হয়েছিলেন ঘাটালের প্রথম সাংসদ নিকুঞ্জবিহারী চৌধুরী। সংসদে তিনি ঘাটালের মানুষের সমস্যাকে; সর্বভারতীয় স্তরে তুলে আনেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর মন্ত্রিসভা; ১৯৫৯ সালে ঘাটাল-সহ সংলগ্ন এলাকার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার জন্য; অর্থনীতিবিদ মান সিংহের নেতৃত্বে কমিটি তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই কমিটি রিপোর্ট পেশ করতেই; পেরিয়ে যায় ২০ বছর।

আরও পড়ুনঃ কার্গিল নায়ক ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রা, একাই খ’তম করেছিলেন একাধিক পাক জ’ঙ্গিকে

১৯৭৯ সালে ওই কমিটির পেশ করা রিপোর্টের ভিত্তিতেই; কেন্দ্রীয় সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন পায় ‘ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান’। ১৯৮২ সালে ঘাটাল শহরের শিলাবতী নদীর ধারে; ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের সূচনা হয়েছিল। তখন প্রকল্পের খরচ ধরা হয়; ৫০ কোটি টাকা। প্রাথমিক ভাবে ৩০ লক্ষ টাকা; অনুমোদনও হয়। ১১৮ কিলোমিটার নদী বাঁধ নির্মাণ-সহ; নানা কাজ ওই প্রকল্পে ছিল।

মাস্টার প্ল্যানটি কার্যকর হলে উপকৃত হওয়ার কথা; ঘাটাল; দাসপুর ১; দাসপুর ২; চন্দ্রকোনা ১; চন্দ্রকোনা ২; কেশপুর; ডেবরা; খড়্গপুর ১; খড়্গপুর ২; মেদিনীপুর; পাঁশকুড়া; কোলাঘাট; ময়না; এই ১৩টি ব্লকের মানুষের। ঘাটাল শহরের পূর্ব পারে শিলাবতীর ধারে, রুপোর কোদাল দিয়ে তৎকালীন বাম সরকারের সেচমন্ত্রী প্রভাস রায়; সেই প্রকল্পের শিলান্যাস করেন। কিন্তু কাজ শুরুর কিছু দিন পরেই। প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়।

ঠান্ডা ঘরে চলে যাওয়া এই প্রকল্প নিয়ে; ২০০৬ সাল থেকে ফের নাড়াচাড়া শুরু হয়। ওই বছর কেন্দ্রের একটি দল; ঘাটালে আসে। তাঁদের নির্দেশে ৯০০ কোটি টাকার; নতুন প্রকল্প তৈরি হয়। প্রথম ধাপে ৩৫০ কোটি টাকার কাজের; সিদ্ধান্তও হয়ে যায়। কিন্তু ওইটুকুই। কেন্দ্র ও রাজ্য কোনও সরকারই বিষয়টি নিয়ে কোনও উদ্যোগ না নেওয়ায়; প্রকল্পটি আবার হিমঘরে চলে যায়।

আরও পড়ুনঃ নবাব আলীবর্দির দরবারে গিয়ে, উলেমা-মৌলবিদদের হারিয়ে এসেছিলেন পন্ডিত জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন

২০০৯ সালে আবার কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্ত একটি সংস্থা; ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের জন্য প্রকল্প রিপোর্ট তৈরির কাজ শুরু করে। ২০১৫ সালে প্রথম ধাপের প্রকল্প রিপোর্টের ছাড়পত্র দেয়; জিএফসি-র (গঙ্গা ফ্লাড কন্ট্রোল কমিশন) পূর্বাঞ্চল শাখা। ফাইলটি পাঠিয়ে দেওয়া হয়; কেন্দ্রীয় অর্থ দফতরে। প্রথম দফায় প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল; ১২১৪ কোটি ৯২ লক্ষ টাকা। আগে এই ধরনের প্রকল্পে; কেন্দ্র ৭৫ শতাংশ ও রাজ্য ২৫ শতাংশ টাকা দিত।

কিন্তু নতুন নিয়মে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়কেই; ৫০ শতাংশ করে টাকা দিতে হবে বলা হয়। নতুন প্রকল্পে কম বেশি ১৪৭ কিলোমিটার নদী ও নদীর বাঁধ সংস্কার; নারায়ণী ও কাঁকি খালে দুটি স্লুইস গেট; পাম্প হাউস, ঘাটাল শহর সংলগ্ন শিলাবতী নদীর বাঁ দিকে দুই কিলোমিটার গার্ডওয়াল-সহ; বিভিন্ন কাজ হওয়ার কথা। কিন্তু সবটাই তো; খাতায় কলমে। প্রথম ধাপের প্রকল্পটি সবুজ সংকেত পেলেও; ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের জন্য এখনও কোনও টাকা বরাদ্দ হয়নি। এ দিকে যত দিন এগোচ্ছে; তত লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে প্রকল্পের খরচ।

শুরুতে যে প্রকল্পের আনুমানিক ব্যায় ছিল ৫০ কোটি টাকা; এখন সেটি গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮০০ কোটিতে। ঘাটাল মাস্টার প্যান রুপায়ণ সংগ্রাম কমিটির আশা ছিল; ঘাটাল থেকে দীপক অধিকারী এবং মেদিনীপুর থেকে মানস ভুঁইয়া যদি জিতে লোকসভায় যান; তাহলে তাঁরা যৌথ ভাবে সংসদে এই বিষয়টি নিয়ে সরব হবেন। দুজনেই সাংসদ হয়েছেন; তবে তাতেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের ‘কুমিরছানা’ দেখিয়ে; ভোট হচ্ছে আর হবেও।

২০০১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তৈরি হয়েছিল; ঘাটাল মহকুমা বন্যা ও ভাঙন প্রতিরোধ কমিটি। তার কয়েক বছর পরে তৈরি হয়েছে; ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান রূপায়ণ সংগ্রাম কমিটি। এই দুটি কমিটি-সহ কয়েকটি সংগঠন বিভিন্ন সময়ে; রাস্তায় নেমে মাস্টার প্ল্যানের কাজ শুরুর দাবিতে আন্দোলন করেছে। প্রতি বছরই বর্ষার আগে ঘাটালের বন্যা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে; অনেক বৈঠক হয়। কিন্ত তারপরেও কাজ হয় না; আর বন্যাও আটকানো যায় না। বর্ষা এসেছে; যথারীতি বানভাসি হয়েছেন ঘাটালের মানুষ। ফের আতঙ্কের প্রহর গোনা; শুরু হয়েছে ঘাটাল জুড়ে। মাস্টার প্ল্যান কি; শুধুই বায়বীয়? জবাব চাইছেন ঘাটালবাসী।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন