দুর্গা পুজোয় আয়কর, রাজনীতি করার জন্যই কি মানুষকে ভুল বোঝাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা

341
দুর্গা পুজোয় আয়কর, রাজনীতি করার জন্যই কি মানুষকে ভুল বোঝাচ্ছেন মমতা/The News বাংলা
দুর্গা পুজোয় আয়কর, রাজনীতি করার জন্যই কি মানুষকে ভুল বোঝাচ্ছেন মমতা/The News বাংলা

বেশ চিন্তায় পরেছেন; কলকাতার পুজো উদ্যোক্তারা। গতবছরের ডিসেম্বরের শেষে; কলকাতার প্রায় ৪০টি বড় পুজোর কর্তারা পেয়েছিলেন; আয়কর দফতরের নোটিশ। কেন কোটি কোটি টাকা আয় ও খরচা করার পরেও; এক টাকাও আয়কর দেন না; টিডিএস জমা করেন না পুজো আয়োজকরা? প্রশ্ন আয়কর দফতরের। ২০১৮ সালের পুজোর সব হিসাব নিয়ে; আয়কর দফতরে দেখা করার নির্দেশও পেয়েছিল কলকাতার ৪০টি পুজো। আর এবার পুজো শুরুর আগেই; এই নিয়ে হইচই শুরু। আন্দোলনে নেমেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

রাজ্যের দুর্গাপুজোয় খরচ হয়; কয়েক হাজার কোটি টাকা। কলকাতায় এক একটি বড় পুজো; কোটি টাকার বেশি খরচা করে। অথচ এক টাকাও আয়কর দেওয়া হয় না। কেন আয়কর দেন না? কেন টিডিএস কাটেন না? এই সব প্রশ্ন নিয়েই; কলকাতার বড় ৪০টি পুজোকে এবার নোটিশ দিয়েছিল ইনকাম ট্যাক্স। চিঠিতে পুজোর খরচা সংক্রান্ত বেশ কিছু প্রশ্নের জবাব চেয়ে; অফিসে এসে দেখা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল উদ্যোক্তাদের।

আয়কর দফতরের নোটিশ, মাথায় হাত কলকাতার পুজো উদ্যোক্তাদের/The News বাংলা
আয়কর দফতরের নোটিশ, মাথায় হাত কলকাতার পুজো উদ্যোক্তাদের/The News বাংলা

আর এবার পুজো শুরুর আগেই; এই নিয়ে হইচই শুরু করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। কিন্তু কেন? দুর্গা পুজোয় আয়কর নিয়ে; রাজনীতি করার জন্যই কি মানুষকে ভুল বোঝাচ্ছেন মমতা? নাকি ধর্মকে কাজে লাগিয়ে; মোদী বিরোধিতা? উঠে গেছে প্রশ্ন।

ইনকাম ট্যাক্সের মূল প্ৰশ্ন হল; মণ্ডপ শিল্পী বা থিম শিল্পী, প্রতিমা শিল্পী, আলোক শিল্পী, বাজনদার সকলকেই টাকা দেয় পুজো কমিটিগুলি। অথচ প্রদান করা সেই টাকা থেকে; টিডিএস বা ট্যাক্স ডিডাকটেড অ্যাট সোর্স কেটে; তা আয়কর দফতরের কাছে জমা করে না কোন পুজো উদ্যোক্তাই। কোটি কোটি টাকা আয় ও খরচা হলেও; সোর্স অফ ইনকাম ও খরচা এসবের অডিট করায় না কেউই।

আরও পড়ুনঃ আপনি কি খেতে ভালোবাসেন, শহর ও শহরতলীর সেরা একশোটি খাবারের জায়গা

কোনো হিসাব আয়কর দফতরে কেন জমা পরে না; কেন লক্ষ টাকা পেমেন্ট করা সত্ত্বেও টিডিএস কাটা হয় না; এই সব প্রশ্নের ক্লারিফিকেশন বারবার চেয়েছে ইনকাম ট্যাক্স। আয়কর দফতর সূত্রে জানা গেছে; ২০১৮ সালে রাজ্যে দুর্গাপুজোয়; প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা খরচা হয়েছে। অথচ দু-একটি পুজো উদ্যোক্তা ছাড়া; কেউই টিডিএস কেটে ইনকাম ট্যাক্সে জমা দিচ্ছেন না।

অথচ ১৯৬১ সালের ইনকাম ট্যাক্স রুলস অনুযায়ী; কাউকে তাঁর কাজের বিনিময়ে কোনও টাকা দেওয়া হলে; টিডিএস কাটতে হবে এবং তা আয়কর দফতরে জমা করতে হবে। আয়কর দফতরের কর্তারা জানাচ্ছেন; শিল্পীদের লাখ লাখ টাকা দেওয়া হয়; যার টিডিএস; আয়করের পাওয়ার কথা; কিন্তু একটা টাকাও জমা পরে না।

আয়কর কর্তাদের মতে; এখন দুর্গাপূজায় সম্পূর্ণ পেশাদারদের দিয়েই; কাজ করানো হয়। সে ক্ষেত্রে খরচের ১০ শতাংশ; আয়কর দফতরে জমা পড়ার কথা। কিন্তু কিছুই জমা পরে না। ইনকাম ট্যাক্স কর্তারা আরও জানাচ্ছেন; রাজ্যে দুর্গাপূজায় প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা খরচা হয়। কাজ করানো হয় পেশাদের দিয়ে। ১০ শতাংশ টিডিএস বাবদ; আয়করে জমা পড়ার কথা প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এই বিশাল টাকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে আয়কর দফতর। তবে এই ৪ হাজার কোটি টাকার গল্প; উড়িয়ে দিয়েছেন পুজো উদ্যোক্তারা।

আরও পড়ুনঃ ম্যাডাম-এর মুখের আদলেই করতে হবে দেবী দুর্গার মুখ, দুর্গা পুজোয় কে এই ম্যাডাম

আর এই বিশাল হিসাব দেখেই; এবার কোমর বেঁধেছেন আয়কর দফতরের কর্তারা। প্রাথমিক পর্বে ২০১৮ পুজো শেষের পরেই; ডিসেম্বরে নোটিশ পাঠানো হয়; কলকাতার প্রায় ৪০টি পুজো উদ্যোক্তাদের। এক আয়কর কর্তা জানিয়েছেন; উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার ৪-৫টি পুজো কমিটি ছাড়া; টিডিএস কাটা ও তা আয়কর দফতরে জমা করার কথা ভাবেই না কেউ।

ইনকাম ট্যাক্সের নোটিশ পেয়ে; চিন্তার ছায়া পুজো উদ্যোক্তাদের মাথায়। শিল্পীদের পেমেন্ট থেকে; ১০ শতাংশ টাকা কাটা যাবে কি? না হলে শিল্পীদের পেমেন্ট দেবার পর; আবার টিডিএস দেওয়াটা আরও খরচ সাপেক্ষ ব্যপার। সেটাও বহন করতে হবে পুজো আয়োজকদেরই।

পেশায় আইনজীবি, কাশী বোস লেন পুজো কমিটির; অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা সৌমেন দত্ত জানিয়েছেন, “শুধু শিল্পীদের ক্ষেত্রে টিডিএস কাটা সম্ভব। বাকি তো গ্রাম থেকে; গরিব কারিগরেরা এসে কাজ করেন। তাঁদের বেশির ভাগেরই প্যান কার্ড নেই। অনেকের ব্যাংক একাউন্টও নেই। তা ছাড়া এত হিসেব কে রাখবে? পুজো করব, না এ সব করব”?

হাতিবাগান সর্বজনীন এর পুজো উদ্যোক্তা ও তৃণমূল নেতা শাশ্বত বাসু বলছেন; “আয়কর দেওয়া উচিত; আমরা ট্যাক্স ফাইল করি। কিন্তু টিডিএস আমরা কি করে কাটব”? তিনি আরও জানান, তাঁরা টিডিএস কাটলে; শিল্পীদের ও বাজনদারদেরও পুজো সংক্রান্ত বিষয়ে; ট্যাক্স ফাইল করতে হবে। সেটা কি সম্ভব?

বেশির ভাগ পুজো উদ্যোক্তারা বলছেন; “থিম শিল্পী থেকে বাজনদার বা ডেকরেটর থেকে আলোক শিল্পী, কেউ তো আর টাকা কম নেবেন না। ফলে, টিডিএস-এর টাকা; আমাদের উপরেই বর্তাবে। বিষয়টি নিয়ে আইনজীবীদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে”। অনেকেই বলেছেন; “পুজো আয়োজন সমাজসেবার মধ্যে পরে; সেখানে ছাড় পাওয়া উচিত”।

কেউ কেউ আবার এর পিছনে; ভোটের রাজনীতির অঙ্কও দেখছেন। কারণ, কলকাতার প্রধান পুজোগুলির বেশিরভাগেরই; উদ্যোক্তা হয় রাজ্যের মন্ত্রী, নয়তো তৃণমূলের প্রথম সারির নেতা। অনেকের আবার সভাপতি তৃণমূল নেতা মন্ত্রী। তাঁদের চাপে রাখতেও আয়কর দফতর; এমন পদক্ষেপ করে থাকতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

শুধু বাংলার দুর্গা পুজোয়; কেন নজর দিল আয়কর দফতর? সেই প্রশ্নও তুলছেন পুজো উদ্যোক্তা ও কলকাতা পুরসভার মেয়র পারিষদ দেবাশিস কুমার। তাঁর মতে; “মুম্বইয়ের গণেশপুজোয় তো; এর থেকে অনেক বেশি জাঁকজমক হয়। সেখান থেকে কি কর চাওয়া হচ্ছে”? দেবাশিস কুমার জানিয়েছেন; তাঁরা টিডিএস কেটে জমা দেন; এই নিয়ে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু পুজোর সঙ্গে বেশিরভাগ তৃণমূল নেতা কর্মীরা যুক্ত আছেন; তাই এই রাজনৈতিক চক্রান্ত কেন্দ্রীয় সরকারের।

ঠিক একই কথা বলেছেন রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস; ববি হাকিম থেকে শুরু করে পুজো উদ্যোক্তা ও উত্তর কলকাতার অনেক পুজোর সঙ্গে জড়িত থাকা অতীন ঘোষও। “পুজোর সঙ্গে তৃণমূল নেতারা সবাই জড়িত; তাই দেশের সব পুজোকে ছেড়ে; বাংলার দুর্গা পুজোকে টার্গেট কেন্দ্রীয় সরকারের”, অভিযোগ সবার।

উত্তর কলকাতার এক পুজো উদ্যোক্তা আবার বলেছেন, “প্রতিবছর দিদির দেওয়া ১০ হাজার টাকা অনুদান; কেটে নেবার চক্রান্ত করেছে মোদী। তাই এই পদক্ষেপ”। সব মিলিয়ে ২০১৯ এর পুজোর শুরুতেই; পুজো উদ্যোক্তাদের মাথায়; চিন্তার পাহাড় চাপিয়েছে আয়কর দফতর। আর এই নিয়েই আন্দোলন শুরু করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। তবে মানুষকে ভুল বোঝাচ্ছেন কেন? এটাই এখন বিরোধীদের প্রশ্ন।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন