শিকারি যখন নিজেই শিকার, ‘বিক্রান্ত’কে পথ থেকে সরাতে এসে ভারতের ‘রাজপুতের’ হাতে সলিলসমাধি পাক ‘গাজি’র

6224
শিকারি যখন নিজেই শিকার, 'বিক্রান্ত'কে পথ থেকে সরাতে এসে ভারতের 'রাজপুতের' হাতে সলিল সমাধি পাক 'গাজি'র
শিকারি যখন নিজেই শিকার, 'বিক্রান্ত'কে পথ থেকে সরাতে এসে ভারতের 'রাজপুতের' হাতে সলিল সমাধি পাক 'গাজি'র

শিকারি যখন নিজেই শিকার, ‘বিক্রান্ত’কে পথ থেকে সরাতে এসে; ভারতের ‘রাজপুতের’ হাতে সলিলসমাধি হয় পাক ‘গাজি’র। ভারত-পাকিস্তান নৌ যুদ্ধ; বিস্ফোরণ হয়ে ডুবে গিয়েছিল গাজী সাবমেরিন। দিনটা ছিল; ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর। ভারত-পাক যুদ্ধে, শক্তিশালী দাবার ঘুঁটি ছিল; ‘আইএনএস বিক্রান্ত’। এই এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের নেতৃত্বে; পূর্ব পাকিস্তানে নৌ অবরোধ করে রাখে দেশের নৌবাহিনী। ফলে মুক্তিবাহিনীর হাতে মার খেয়ে, রসদের অভাবে; শক্তিশালী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে ওঠে। তাই যে কোনো মূল্যে ভারতীয় এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারকে; ধ্বংস করতে গোপন মিশনে পাঠানো হয় তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম সেরা সাবমেরিন ‘পিএনএস গাজী’কে।

কিন্তু ৪ ডিসেম্বর রাতে ভারত মহাসাগরের বুকেই; সমাধি হয়েছিল সাবমেরিনটির। ফলে কোণঠাসা হতে থাকা পাকিস্তানের; সব আশাই শেষ হয়ে যায়। পাকিস্তান নৌবাহিনীকে আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তার করতে হলে; ‘স্ট্রাটেজিক ওয়েপন’ হিসেবে সাবমেরিন কিনতেই হবে। সামরিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ১৯৬৩ সালে; পাকিস্তানকে ‘ইউএসএস ডিয়াবলো’ নামক ট্রেঞ্চ ক্লাস ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিনটি লিজ দেয় আমেরিকা। পুরনো হলেও; বেশ কার্যকর ছিল সাবমেরিনটি। এটিকেই পিএনএস গাজী নামে; পাকিস্তান নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

উর্দু গাজী শব্দের; বাংলা অর্থ ‘বীর’। এটি ছিল পাকিস্তানের; প্রথম সাবমেরিন। তাদের ৩ বছর পর, ভারত সামরিক ভারসাম্য রক্ষায়; সাবমেরিন কেনে। ৩১২ ফুট লম্বা গাজি সাবমেরিন, জলের উপরে ঘন্টায় ৩৭.৫০ কিলোমিটার; এবং জলের নিচে ঘন্টায় ১৬.২১ কিলোমিটার বেগে চলতে সক্ষম ছিল। এটি রিফুয়েলিং ছাড়া, একটানা ২০ হাজার কিলোমিটার; পাড়ি দিতে সক্ষম ছিল। সর্বোচ্চ ৪৫০ ফুট গভীরতায় ডুব দিয়ে; একটানা ৪৮ ঘন্টা জলের নিচে থাকতে পারত। শত্রুর ‘সোনার’ চোখকে ফাঁকি দিতে, ডিজেল ইঞ্জিন বন্ধ করে; ব্যাটারি চালিত ইলেকট্রিক প্রপালশন সিস্টেমও ব্যবহার করতে পারত গাজি।

আরও পড়ুনঃ ২৩শে জুলাই এমন এক ভারতীয় বিপ্লবীর জন্মদিন, যার নাম শুনলে কাঁপত ব্রিটিশ বাহিনী

অস্ত্রশস্ত্রের দিক দিয়েও; বেশ শক্তিশালী ছিল গাজী। এর সামনের দিকে ১০টি এবং পিছনের দিকে ৪টি; টর্পেডো টিউব ছিল। ফলে এটি দুই দিক দিয়েই; আক্রমণ করতে পারত। সব মিলিয়ে মোট ২৮টি টর্পেডো; বহন করতে পারত। এজন্য ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধেও; ‘অপারেশন দ্বারকা’ চলাকালে পিএনএস গাজীকে মুম্বাই নৌঘাঁটি থেকে আগত ভারতীয় যুদ্ধজাহাজকে ফাঁদে ফেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়। যুদ্ধে সাহসী ভূমিকা রেখে; ১০টি পুরস্কার পায় পিএনএস গাজী। এরই ধারাবাহিকতার জন্য, তাকে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে; স্পেশাল অপারেশনে পাঠানো হয়।

বিক্রান্ত হবে আক্রান্ত
পূর্ব পাকিস্তানে নিজ দেশের নাগরিকদের উপর; পাকিস্তান সেনাবাহিনী হামলা করতেই বাঙালিদের সাহায্য করতে শুরু করে পাকের চিরশত্রু ভারত। তারাও আশঙ্কা করছিল যে; আরেকটি পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হতে পারে। ভারতীয় এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার আইএনএস বিক্রান্তকে; বঙ্গোপসাগরে নেভাল ব্লকেড দিতে মোতায়েন করা হয়। এটি ছিল ভারতীয় নৌবাহিনীর; ইস্টার্ন নেভাল কমান্ডের ফ্ল্যাগশিপ। তৎকালে এর সমকক্ষ কোন যুদ্ধজাহাজ; পাকিস্তান নৌবাহিনীতে ছিল না।

১৯৭১ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে, প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে; পিএনএস গাজীকে বঙ্গোপসাগরে পাঠানো হয়। লক্ষ্য আইএনএস বিক্রান্তকে ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করে; যুদ্ধের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া। তবে তখন পর্যন্ত ভারত-পাকিস্তানের; সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়নি। তাই পুরো পরিকল্পনাই ছিল; অত্যন্ত গোপন। তবে পাকিস্তানে থাকা, এক নারী গুপ্তচর সূত্রে; ঠিকই খবর পেয়ে যায় ভারত।

আরও পড়ুনঃ লোহার শিকলে গঙ্গা ঘিরে, ইংরেজদের জাহাজ চলা বন্ধ করেছিলেন রানী রাসমণি

পরিকল্পনা অনুযায়ী গাজি সাবমেরিনটি; ১৪ নভেম্বর, ১৯৭১ সালে রওনা দেয়। আরব সাগরের তীরে করাচি বন্দর হয়ে; পিএনএস গাজী পুরো পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারত পার করে; শ্রীলঙ্কার জলসীমা দিয়ে ঢুকে পূর্বপ্রান্তে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছে যায়। ৪,৮০০ কিলোমিটারের এই যাত্রার পুরোটা সময় তাদেরকে; ভারতীয় নৌবাহিনীর চোখে ধরা পড়া থেকে বাঁচতে লুকোচুরি খেলতে হয়েছে। গাজীর কমান্ডার ছিলেন; জাফর মহম্মদ খান। দলে ছিল মোট; ৯২ জন নাবিক।

শিকারি যখন নিজেই শিকার
১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর; পাকিস্তান ভারতে আক্রমণ শুরু করে। ফলে আরব সাগরের পর এবার বঙ্গোপসাগর; দুদেশের নৌ-যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। তখন আইএনএস বিক্রান্ত; অবস্থান করছিল মাদ্রাজ বন্দরে। ২৩ নভেম্বর থেকে গাজী; বিক্রান্তকে খুঁজতে শুরু করে। কিন্তু গোয়েন্দা তথ্যের অভাবে; সে ছিল ১০ দিন পিছিয়ে। হেডকোয়ার্টারের নির্দেশ পেয়ে গাজী এবার; তার দ্বিতীয় অবজেক্টিভ পূরণের কাজ শুরু করে। তাদের লক্ষ ছিল; বিশাখাপত্তনম বন্দর ধ্বংস করা।

২-৩ ডিসেম্বর রাতে, বিশাখাপত্তনম বন্দর চ্যানেলে; নেভাল মাইন পেতে রাখার কাজ শুরু করে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হল, ঐ সময় আইএনএস বিক্রান্ত; অবস্থান করছিল বিশাখাপত্তনম বন্দরেই। এরই মধ্যে পাকিস্তান নেভাল হেডকোয়ার্টারের সঙ্গে; গাজীর রেডিও যোগাযোগ টের পায় ভারতীয় নৌবাহিনী। ইন্টারসেপ্ট করা মেসেজ বিশ্লেষণ করে; তারা বুঝতে পারে, গাজীর টার্গেট বিক্রান্ত। এরপরেই, ভারতের ডেস্ট্রয়ার শ্রেণীর যুদ্ধজাহাজ; আইএনএস রাজপুতকে ব্যাপারটি তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

আরও পড়ুনঃ ইতিহাসে পড়ানো হয় না, আফগানদের পরাজিত করে ভারত ভূমি রক্ষা করেছিলেন নাগা সন্ন্যাসীরা

গাজী বিশাখাপত্তনম বন্দরের আশেপাশে আছে টের পেয়ে; রাজপুতকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর রাতে; আইএনএস রাজপুতের নজরে আসে; বিশাখাপত্তনম বন্দরের কাছে অস্বাভাবিক আলোড়ন। একাধিক বয়া ভাসমান ছিল বলে; ব্যাপারটি সহজে চোখে পড়ে এক নাবিকের। রাজপুতের ক্যাপ্টেন সেদিকে ফুল স্পিডে ধেয়ে যান; এবং দুটো সাবমেরিন বিধ্বংসী ডেপথ চার্জ ফায়ার করা হয়। চ্যানেলটি বেশ সরু ছিল, ডেপথ চার্জের কনকাশনে; রাজপুত নিজেও সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে আশেপাশে কোনো সাবমেরিনের দেখা না পেয়ে; রাজপুত এবার ভিন্ন কোর্সে গাজীকে খুঁজতে বের হয়।

কিছুক্ষণ পরেই বিশাখাপত্তনম উপকূলে; প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। ৫ ডিসেম্বর সকালে স্থানীয় জেলেরা; একটি জাহাজের নেভিগেশন চার্ট, লগবুক ও কিছু ছেঁড়া কাগজপত্র, এবং লাইফ জ্যাকেট পান। সন্দেহ হওয়ায় ভারতীয় নৌবাহিনীর উদ্ধারকারী জাহাজ; আইএনএস নিশতারকে সেই স্থানে পাঠানো হয়। আশেপাশে খোঁজাখুঁজি করে ডুবুরিরা দেখেন; সাগরের নিচে পাকিস্তানী সাবমেরিন গাজী পড়ে রয়েছে। বিস্ফোরণে দুমড়ে মুচড়ে গেছে; পুরো ডুবোজাহাজটি। মৃত্যু হয়েছে ৯২ জন; পাকিস্তানি নৌ-সেনার। ভেসে ওঠা কয়েকজন নাবিকের মৃতদেহ উদ্ধার করে; সৎকার করে ভারতীয় সেনারাই।

আইএনএস রাজপুতকে; এই মিশনের কৃতিত্ব দেওয়া হয়। তবে ২০০৩ সালে করা নতুন তদন্তে জানা যায়; বিস্ফোরণ ঘটেছিল গাজির ভেতর থেকেই। রাজপুতের ডেপথ চার্জে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর; গাজীর মধ্যে থাকা সব টর্পেডো একযোগে বিস্ফোরিত হয়। তাতেই সলিলসমাধি ঘটে; পাক ডুবোজাহাজটির। সাফল্যের আনন্দে আত্মহারা হয়; ভারতীয় নৌবাহিনী। এইভাবে ফের একবার ভারতীয় সেনার হাতে; নাস্তানাবুদ হয় পাক সেনা। এই লজ্জাজনক ঘটনা; আজও তাড়া করে বেরায় পাকিস্তানকে। পাকিস্তানে আজও পড়ান হয়, এক দুর্ঘটনায় ভারতের বিশাখাপত্তনম বন্দরের কাছে; ডুবে গেছে পাকিস্তানের গর্ব গাজি। তবে আসল ঘটনা গোটা বিশ্বের সঙ্গে; পাকিস্তানের মানুষও জানেন।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন