ভারতের সেরা গুপ্তচর ব্লাক টাইগারের রোমহর্ষক কাহিনী, র এজেন্ট হয়েছিলেন পাক সেনাবাহিনীর মেজর

334
ভারতের সেরা গুপ্তচর ব্লাক টাইগারের রোমহর্ষক কাহিনী, হয়েছিলেন পাক সেনাবাহিনীর মেজর/The News বাংলা
ভারতের সেরা গুপ্তচর ব্লাক টাইগারের রোমহর্ষক কাহিনী, হয়েছিলেন পাক সেনাবাহিনীর মেজর/The News বাংলা

ভারতের সেরা গুপ্তচর ব্লাক টাইগারের রোমহর্ষক কাহিনী; আমাদের অবাক করে দেয়। ভারতের সেরা স্পাই হয়েছিলেন; পাক সেনাবাহিনীর মেজর। শত্রুদেশে গিয়ে একদেশের গুপ্তচর; অন্যদেশের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে মেজর পদ পেয়েছেন; এমন উদাহরণ পৃথিবীতে সম্ভবত একটাই। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর সেই দুঃসাহসিক আন্ডারকাভার এজেন্ট; রবীন্দ্র কৌশিকের জীবনটিও তাই দুর্দান্ত রোমাঞ্চ ও বিবর্ণ ট্র্যাজেডিতে ঠাসা।

১৯৫২ সালের ১১ এপ্রিল; রাজস্থানের শ্রী গঙ্গানগরে জন্মেছিলেন রবীন্দ্র কৌশিক। কৈশোরে পা দিয়েই তিনি প্রেমে পড়েছিলেন অভিনয়ের। তখন থেকেই মঞ্চে কখনও চন্দ্রশেখর আজাদ; কখনও ভগত সিংয়ের মতো চরিত্রে অভিনয় করে; তাক লাগাতেন সবাইকে। ১৯৬৫-৭১ এর উত্তাল সময়ে; যার কৈশোর কেটেছে নিজের দেশের সঙ্গে প্রতিবেশি দেশ পাকিস্তানের দ্বৈরথ দেখে; তার মধ্যে জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগ সঞ্চার হওয়াটা বিস্ময়কর কিছু নয়।

আরও পড়ুনঃ ভারত ছাড়ো স্লোগান মহাত্মা গান্ধী সৃষ্টি করেননি, কে করেছিলেন জেনে নিন

রবীন্দ্রের অভিনয় নজর কাড়ে; ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘রিসার্চ এন্ড অ্যানালাইসিস উইং (RAW)’ এর কর্মকর্তাদের। কর্মকর্তারা রবীন্দ্রকে তাদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির প্রস্তাব দেন। ঝুঁকি থাকলেও গর্ব আছে; জাতীয়তাবাদী মানুষের কাছে এ ধরনের পেশার মর্ম এমনই। সাহসী সদ্য-তরুণ রবীন্দ্রও; তাই সেই প্রস্তাব লুফে নেন। ছদ্মপরিচয়ের আড়ালে থাকতে হবে ‘চিরশত্রু’ দেশ পাকিস্তানে; এই শর্ত জেনেও পিছপা হননি তিনি।

পড়াশোনার পাঠ কোনোরকম চুকিয়েই; বাড়ির কাউকে সেভাবে কিছু না জানিয়েই তিনি চলে যান দিল্লিতে; র এর কাছে। সেখানে টানা দুই বছর রবীন্দ্র কৌশিককে যেতে হয়; কঠোর প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে। এই সময়টায় কালেভদ্রে পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন রবীন্দ্র।

পাকিস্তানের মূলধারায় মিশতে; উর্দু জানার বিকল্প নেই। আর সামরিক বাহিনীর মতো স্পর্শকাতর জায়গায়; কারোর সন্দেহদৃষ্টি এড়াতে বিশুদ্ধ পাকিস্তানী (লাহোরি) ঢঙে; উর্দু বলতে পারাটা ছিলো আরো জরুরি। তাই রবীন্দ্রর প্রশিক্ষণের প্রথম পর্বই ছিলো ভাষা। ভাষার পর পাকিস্তানের সংস্কৃতি ও ভৌগোলিকতারও; বিশদ পাঠ দেওয়া হয় রবীন্দ্রকে। সেই সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ; ও গুপ্তচরবৃত্তির সবকিছুই শেখানো হয় হাতেকলমে।

ভারতের সেরা গুপ্তচর ব্লাক টাইগারের রোমহর্ষক কাহিনী, হয়েছিলেন পাক সেনাবাহিনীর মেজর/The News বাংলা

যেহেতু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ‘মুসলিম’ পরিচয়েই পাঠানো হত; ফলে রবীন্দ্রকে কোরান পঠন-পাঠনসহ ইসলামের যাবতীয় রীতিনীতিও শেখানো হয়। এমনকি ‘নবী আহমেদ শাকির’ নামধারণ করে; পাকিস্তানে প্রবেশের আগে রবীন্দ্রকে খতনাও (Circumcision) করানো হয়; যাতে তার মুসলিম পরিচয় নিয়ে আর কোনও সন্দেহের অবকাশ না থাকে!

দুবাই হয়ে ১৯৭৫ সালে ২৩ বছর বয়সে পাকিস্তানে প্রবেশ করেন রবীন্দ্র ওরফে ‘শাকির’। র এর বানানো জাল কাগজ দিয়ে; নিমেষেই পাকিস্তানি নাগরিকত্বের সনদও বানিয়ে ফেলেন তিনি। সামরিক বাহিনীতে যোগদানের সুবিধার্থে; পাকিস্তানের ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার পুনরায় স্নাতক করতেই হত। সেজন্যই তিনি ভর্তি হন; করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। সেখান থেকে পাস করে; ১৯৭৯ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

প্রশিক্ষণ শেষে কমিশন্ড অফিসার হবার পর; তার প্রেম হয় সেনাবাহিনীরই এক দর্জির মেয়ে আমানতের সাথে। বিয়েথা করে থিতু হতে সময় নিলেন না রবীন্দ্র! ঘরে এলো ফুটফুটে কন্যাসন্তান। বেগম আমানত ও সদ্য ভূমিষ্ট কন্যাকে নিয়ে; মাঝে একবার ভারত এসেছিলেন বটে; তবে পরিবারকে বলেছিলেন; “দুবাইতে কাজ করছি”।

পাকিস্তানে ফিরেই সুসংবাদ শোনেন রবীন্দ্র; পদোন্নতি পেয়েছেন মেজর র‍্যাঙ্কে। এর মধ্যে চাকরির চার বছরে; পাকিস্তানের গোয়েন্দাবিভাগ ও সমরকৌশলের নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মোর্স কোডের মাধ্যমে; ভারতে পাচার করতেন রবীন্দ্র। রবীন্দ্রর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যকে কাজে লাগিয়ে; অনেক সামরিক ফায়দা তুলেছে ভারত। এমনও হয়েছে যে; পাকিস্তান রাজস্থান সীমান্তে যুদ্ধের ফাঁদ পেতেছে; ওদিকে ভারত সেটা আগেই টের পেয়ে ফাঁদটাকে পাকিস্তানের জন্য বুমেরাং করে দিয়েছে! র এজন্য তাকে; ‘ব্ল্যাক টাইগার’ উপাধিও দেয়।

আরও পড়ুনঃ গোপন সরকারি ফাইল উধাও, ৬০ এর দশকেও ভারতে বেঁচে ছিলেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু

১৯৮৩ সালে ঘোর বিপদ নেমে আসে রবীন্দ্রর জীবনে। সে বছরের সেপ্টেম্বরে; রবীন্দ্রর সঙ্গে দেখা করতে ইনায়েত মসিহ নামে এক চরকে পাকিস্তানে পাঠায় ‘র’। কিন্তু এই চর ইনায়েত আবার গিয়েই; পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর কাছে ধরা পড়ে যান। ফলে অবধারিতভাবেই ফাঁস হয়ে যায়; ব্ল্যাক টাইগারের আসল পরিচয়। গ্রেফতার হন তিনি। এরপর শিয়ালকোটে দীর্ঘ দুবছর জিজ্ঞাসাবাদের নামে; তার ওপর চালানো হয় সীমাহীন শারীরিক নির্যাতন। ১৯৮৫ সালে নিম্ন আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে; মৃত্যুদণ্ড দিলেও পাক সুপ্রিম কোর্টের রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পান রবীন্দ্র।

সিক্রেট সার্ভিসের নিয়মানুযায়ী; নিজেদের গুপ্তচর শত্রুপক্ষের কাছে ধরা পড়ে গেলে; তার সমস্ত নথি সে দেশ থেকে গায়েব করে দেওয়া হয়। একই কারণে ভারতও তাদের জাতীয় তথ্য থেকে; রবীন্দ্র কৌশিকের সকল রেকর্ড মুছে ফেলে। পাকিস্তান মিডিয়া যখন ফলাও করে; ভারতীয় গুপ্তচরের ধরা পড়বার ঘটনাটি প্রচার করতে লাগলো; ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী; সরাসরি পাকিস্তানের এই দাবিকে নাকচ করে দেন।

সরকার যেখানে তার অস্তিত্ব অস্বীকার করছে; তখন তার মুক্তির জন্য লড়াইটা স্বাভাবিকভাবেই কঠিন হয়ে যায় তার পরিবারের জন্য। তবু রবীন্দ্রর বাবা বিমানবাহিনী প্রাক্তন কর্মকর্তা; জে এন কৌশল; মা অমলা দেবী ও ভাই রাজেশ্বরনাথ যথাসম্ভব লড়াই করে যান। কিন্তু ফল মিলছিল না কিছুতেই। ওদিকে রবীন্দ্রর কারাজীবন কাটছিলো কখনো শিয়ালকোটে; কখনো কোট লখপটে; কখনোবা মিয়ানওয়ালিতে।

এর মধ্যেই তিনি বাঁধিয়ে ফেলেছিলেন যক্ষ্মা ও শ্বাসকষ্ট। অসুস্থ থাকাকালে তিনি গোপনে ভারতের জয়পুরে থাকা; স্বজনদের চিঠি পাঠাতেন। বাবার কাছে পাঠানো এক চিঠিতে লেখেন; “ক্যায়া ভারত জ্যায়সে বড়ে দেশকে লিয়ে; কুরবানি দেনেওয়ালোঁ কো ইয়েহি মিলতা হ্যায়?”

চিঠিগুলোতে ছেলের দুর্বিষহ জীবনের কথা সহ্য করতে না পেরেই; হার্ট অ্যাটাকে মারা যান রবীন্দ্রর বাবা। থেমে থাকেননি মা অমলা দেবী। ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে; একের পর এক চিঠি লিখে গেছেন; কখনো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে; কখনো প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপায়ীকে। অমলা দেবীর বারংবার পাঠানো চিঠির জবাবে; ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের জবাব ছিলো নির্মমভাবে সংক্ষিপ্ত; “বিষয়টি পাকিস্তানের হাতে চলে গেছে”।

দীর্ঘ ১৬ বছর কারাভোগের পর; ২০০১ সালের ২১ নভেম্বর মুলতানের নিউ সেন্ট্রাল জেলে ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের জটিলতায়; শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রবীন্দ্র কৌশিক। কারাগারের পেছনেই কবর দেওয়া হয় তাকে। কৌশলগত কারণে তার মৃতদেহ ফিরিয়ে আনার জন্যও; তৎপরতা দেখায়নি ভারত সরকার। রবীন্দ্রর মৃত্যুর কিছুদিন পরেই; তার স্ত্রী ও কন্যাসন্তানও বেমালুম নিখোঁজ হয়ে যায়।

প্রাক্তন ভারতীয় গোয়েন্দাপ্রধান মলয় কৃষ্ণ ধরের লেখা; ‘মিশন টু পাকিস্তান’ উপন্যাসের মুখ্য চরিত্রটি রবীন্দ্রের ছায়ায় রচিত। এখানে অবশ্য লেখক রবীন্দ্রর স্বীকৃতি দিতে কার্পণ্য করেননি। কিন্তু ভারতের ইতিহাসের পাতায় যার নাম খোদাই হওয়া দরকার ছিল; সেই নাম জানেন না ভারতের কেউই। রবীন্দ্র কৌশিক এর মত মানুষরা নিজেদের সবকিছু বলিদান দিয়ে যাচ্ছেন বলেই; ভারতীয় গণতন্ত্র আজও সুরক্ষিত।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন