গরিব ছিলেন পাননি প্রেমিকা-কে, মুখ্যমন্ত্রী হয়ে অমর করে রাখলেন ভালোবাসাকে

6947
গরিব ছিলেন পাননি প্রেমিকা-কে, মুখ্যমন্ত্রী হয়ে অমর করে রাখলেন ভালোবাসাকে
গরিব ছিলেন পাননি প্রেমিকা-কে, মুখ্যমন্ত্রী হয়ে অমর করে রাখলেন ভালোবাসাকে

গরিব ছিলেন পাননি প্রেমিকা-কে; মুখ্যমন্ত্রী হয়ে অমর করে রাখলেন ভালোবাসাকে। আর্থিক দুরবস্থার জন্য পাননি প্রেমিকাকে; ‘কল্যাণী’র নামেই কি তাঁকে অমরত্ব দিলেন বিধানচন্দ্র রায়? নিজে ছিলেন বিখ্যাত ডাক্তার। আরও ভালো করে বললে; রোগীদের ধন্বন্তরি। ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে থেকে আমৃত্যু; তিনি ওই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। চিকিৎসক হিসেবেও; তাঁর বিশেষ খ্যাতি ছিল। ১৯১১ সালেই তিনি ইংল্যান্ড থেকে; এমআরসিপি এবং এফআরসিএস উপাধি অর্জন করার পর; কলকাতার ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুলে; (বর্তমানে নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ) শিক্ষকতা ও চিকিৎসা পেশা শুরু করেন। তবে তাঁর প্রেমকাহিনীও; অমর হয়ে আছে বাংলায়।

গোটা জীবনে নানা মিথ তৈরি করেছেন; বিধানচন্দ্র রায়। ডাক্তার হবার ইচ্ছা ছিল না; তবুও এইকাজেই হয়ে উঠেছিলেন সর্বসেরা। ভারতের বাইরেও; ছড়িয়ে পড়েছিল তাঁর নাম। তবে তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে; আরও এক আশ্চর্য কিংবদন্তি কাহিনির। যা শেষ হয়; এক অপূর্ণ প্রেমকাহিনিতে। কেন চিরকুমার রইলেন বিধান রায়? যদি সংসার করতেন, তাহলে হয়ত নিজের শরীরের ওপর; এত অনিয়ম করতেন না। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও; এমনটাই বলতেন। কিন্তু কেন? এই কেন-র উত্তর লুকিয়ে; একটি প্রেম কাহিনীতে।

আরও পড়ুনঃ বেমালুম উধাও হয়ে যান, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে ইঞ্জেকশন দেওয়া নার্স রাজদুলারী টিকু

তখন বিধান রায়; সদ্য ডাক্তারি পাশ করেছেন। প্র্যাকটিসও শুরু করেছেন; একটু একটু করে। রোজগার খুব বেশি নয়। পারিবারিক দিক থেকেও খুব বিত্তশালী; তাও নয়। সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবার। সেই সময়ই হৃদয় বিনিময় হল; কিংবদন্তি ডাক্তার নীলরতন সরকারের মেয়ে কল্যাণীর সঙ্গে। একটা সময় সেই খবর জানতে পারলেন; ডাক্তার নীলরতন সরকার। একদিন ডাকলেন বিধানকে। জিজ্ঞেস করেছিলেন; তাঁর রোজগার সম্পর্কে। অঙ্কটি শুনে নীলরতনের জবাব ছিল; তাঁর মেয়ের হাতখরচ এর থেকে বেশি।

জবাবটা ভালো লাগেনি বিধান রায়ের। বুঝে গিয়েছিলেন, এই সম্পর্ক আর; পরিণতি পাবে না। সেই আবেগই কি তাঁকে; চিরকাল একা করে রাখল? চিরকুমার হয়ে রইলেন তিনি? অন্তত জনপ্রবাদ তো তাই বলে! কিন্তু এর কি লিখিত প্রমাণ আছে কোন? নাহ! নেই! তবে লোকের মুখে-মুখে যে কাহিনি এসে পৌঁছেছে একুশ শতকেও; তাকে কি এক ফুঁয়ে উড়িয়েও দেওয়া যায়! কত জনশ্রুতির তো; কোন প্রমাণই নেই।

আরও পড়ুনঃ আরব হানাদার-দের দমন করেও, ভারতের ‘ধর্মনিরপেক্ষ ইতিহাসে’ জায়গা পাননি, রাজা বাপ্পাদিত্য রাওয়াল

এই ঘটনার সমান্তরালে এসে জুড়ে যায়; বিধানচন্দ্র রায়ের জীবনের আরও একটি অধ্যায়। তখন তিনি মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে। ১৯৫০ সালে কলকাতা থেকে ৫০ কিমি দূরে; নদিয়া জেলার একটি জায়গায় তৈরি করলেন; বাংলার একটি শিল্প শহর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গঙ্গার ধারে জায়গাটি ছিল; মার্কিন সেনাদের ছোটোখাটো উপনিবেশ; নাম ছিল ‘রুজভেল্ট নগর’। পরবর্তী সময় সেখানেই বিধানচন্দ্র তৈরি করলেন; ‘কল্যাণী’।

নামটা কি খুব কাকতালীয়? অনেকের মতে, প্রিয়তমা কল্যাণীর সঙ্গে অপূর্ণ পরিণয়ের স্মৃতি থেকেই; এই নামটি বেছেছিলেন বিধান রায়। আজ কল্যাণী রীতিমতো; একটি স্মার্ট সিটি। আধুনিকতার আড়ালে কি লুকিয়ে আছে; একটি কিংবদন্তি প্রেমকথা? অদ্ভুতভাবে, ইতিহাসে যখনই ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের প্রসঙ্গ এসেছে; তখনই তুলনায় এসেছেন তাঁর শিক্ষক নীলরতন সরকার। রবীন্দ্রনাথের চিকিৎসার সঙ্গেও; যুক্ত ছিলেন দুজনে। অথচ জীবনের অন্যতম ট্র্যাজেডির সঙ্গে; জড়িয়ে আছে সেই নামটিও।

কিন্তু জীবনের মঞ্চে তিনি; হেরে যেতে শেখেননি তিনি। লড়াই চালিয়ে গেছেন। ডাক্তার হিসেবে তো বটেই; রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।সরকারি নিয়মের তোয়াক্কা না করে; বিধানচন্দ্র রায় নিজে উদ্যোগ না নিলে হয়ত; সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালী’র মুক্তি নিয়েও তৈরি হত; গভীর জটিলতা। মুখ্যমন্ত্রী হয়ে যাবার পরেও, নিজের বাসভবনে সকালবেলায়; বিনে পয়সায় রোগী দেখতেন।

আরও পড়ুনঃ বিশ্বে প্রথম মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন এক বাঙালি নারী

অথচ নিজের শরীরটা যে শেষ হয়ে যাচ্ছে; সেদিকে নজরও দিতেন না। এইভাবেই নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন; এক অন্য উচ্চতায়। নিজেই হয়ে উঠেছিলেন ইতিহাসের অংশ। বিধানচন্দ্র রায় যে লড়াইয়ের ময়দান; ছেড়ে চলে যেতে শেখেননি! মৃত্যুর হাত থেকে; রক্ষা করেছিলেন কতজনকে! তাঁর রোগীদের মধ্যে ছিলেন; মতিলাল নেহরু; মহাত্মা গান্ধী, চিত্তরঞ্জন দাশ-সহ আরও অনেকে।

তবুও নিজের অসুস্থতার সময় বলেই বসলেন; কোনো ওষুধই আর বাঁচাতে পারবে না। নিজের শেষ যে ঘনিয়ে আসছে; আস্তে আস্তে একটা কালো পর্দা নেমে আসছে; এমনটা বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। কিন্তু কে আর জানত; জন্মদিনের দিনই চিরতরে চলে যাবেন তিনি; তখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তিনি। দিনটা ১ জুলাই ১৯৬২; বিধান রায়ের জন্মদিন। একই দিনে জন্ম এবং মৃত্যু এমনই অদ্ভুত সমাপতন; যে ব্যক্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে; তাঁর নাম ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়।

লিখলেন শংকর চক্রবর্তী (তথ্য ও লেখা লেখকের নিজের)

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন