ক’ঙ্কালমালিনী কালী, মনোহর ডা’কাত আর মনোহরপুকুর রোডের গল্প

1919
ক'ঙ্কালমালিনী কালী, মনোহর ডা'কাত আর মনোহরপুকুর রোডের গল্প
ক'ঙ্কালমালিনী কালী, মনোহর ডা'কাত আর মনোহরপুকুর রোডের গল্প

দক্ষিণ কলকাতায় গড়িয়াহাট যাবার পথে; ট্রাংগুলার পার্ক এর ঠিক পাশেই দেখা যায়; একটা ছোট্ট কালীমন্দির। চারদিকে বড় বড় বাড়ির মাঝে; সে কোণঠাসা হয়ে গেছে। খুব একটা খেয়াল না করলে; চোখেই পরে না এই মন্দির। কালীমন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এক দু’র্ধষ ডা’কাত; যার নাম ছিল মনোহর বাগদি। কালীপুজোর ঠিক আগে, ক’ঙ্কালমালিনী কালী, মনোহর ডা’কাত আর মনোহরপুকুর রোডের গল্প। পাথরের কালীমূর্তিটি; ছোট হলেও ভী’ষণদ’র্শনা। প্রতিষ্ঠার সময় কোনো অলঙ্কার ছিল না; দেবীর গায়ে। দেবী ছিলেন আয়ুধভূষিতা, মুন্ডমালা-বিভূষিতা; আর হাতে ছিল ন’রব’লি হওয়া কোনো হতভাগ্যের ক’রোটি। এই কালীপূজো প্রতিষ্ঠা করে; ডা’কাত মনোহর বাগদি ও তার দলবল। আজকের দিনেও, এই কালীমন্দিরে গেলে; আপনার গা ছম-ছম করবে।

টুকরো টুকরো জনশ্রুতিতে জানা যায়; পলাশীর যুদ্ধের শেষের সময়ে। সেই সময় বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির; শাসন শুরু হয় নি। চারিদিকে চলছিল অরাজকতা। আর সেই সময়, কালীঘাট সহ দক্ষিণ কলকাতার; এই পুরো এলাকাটা ছিল গভীর জঙ্গলে ভরা; আর তার মাঝে বয়ে যেত আদিগঙ্গা। লোকজন কালীঘাট দর্শনের জন্য; এই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, অথবা নৌকাপথে; আদিগঙ্গার উপর দিয়ে আসতো। আর এই জঙ্গলের মধ্যেই ছিল; মনোহর ডা’কাতের আস্তানা।

এরকম সময়ে, এক গভীর রাতে; মনোহর ডা’কাত দলবল সহ ডা’কাতি করে; জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ফিরছিল তার আস্তানায়। হটাৎ তাদের চোখে পড়ে, একজন মহিলা বাঘের আ’ঘাতে আ’হত হয়ে; খালের কাদায় পড়ে আছে। আর তার পাশে পাঁচ-ছয় বছরের ছেলে; অ’জ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। তারা তুলে নিয়ে আসে দুজনকে; কিন্তু অনেক সেবা-শুশ্রূষা করার পরেও; মহিলার মৃ’ত্যু হয়, আর ছেলেটি বেঁচে ওঠে।

মনোহর ডা’কাত মহিলা এবং শিশুদের উপর; কোনো অ’ত্যাচার করত না। তাই ছেলেটিকে নিয়ে সে পড়লো মহা ফ্যাসাদে! কার বাড়ির ছেলে, সেটা খুঁজে বের করতে গেলে মহা বিপদ; আবার এই ছোট ছেলেকে সে রাখেই বা কোথায়! শেষে মনোহর নিজের ছেলের মতো তার দেখভাল করত; তাকে গল্প শোনাত। তার জন্য ভালো জামাকাপড় জোগাড় করে নিয়ে আসত। ছেলেটির আগের স্মৃতি কিছু ছিল না; মনোহর তার নাম দিলো হারাধন।

সন্তান স্নেহ যে মানুষকে কতটা বদলে দিতে পারে; সেটার আর একটা উদাহরণ হল মনোহর ডা’কাত। যত দিন যায়, হারাধনের উপরে মনোহরের স্নেহ; আরো বেড়ে চলে। ডা’কাতি করার উৎসাহ ক্রমশঃ; কমে যেতে থাকে তার। দলের লোকেরা অনেক অনুরোধ করলে; তবে সে এক এক দিন যেত ডা’কাতি করতে।

ধীরে ধীরে হারাধন বড়ো হতে লাগল; আর মনোহর বৃদ্ধ হতে লাগল। মনোহরকে একটা চিন্তা সবসময় তাড়া করতো; যে তার পরে হারাধনের কি হবে! এর মধ্যে, ভবানীপুর অঞ্চলে ক্রিশ্চান পাদ্রীরা; ছোট ছোট পাঠশালা খুলছিলেন। তারা গরিব-দুঃখী ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখাতেন; খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা দিতেন এবং বাইবেল পড়াতেন। মনোহর তাদের কাছে ছেলেকে নিয়ে গিয়ে; ভর্তি করে দিল। হারাধনের নাম হলো হারাধন বিশ্বাস; বাবা মনোহর বিশ্বাস। মেধাবী হারাধন, খুব যত্ন করে; লেখাপড়া শিখতে লাগল।

এদিকে দিনে দিনে জ’রার ভারে; মনোহরের শক্তি কমে আসছিল। আগের মতো চলাফেরা করতে পারতনা সে। অন্যদিকে কোম্পানির শাসন শুরু হয়ে গেছে; তাই চু’রি ডা’কাতি রা’হাজানি কমে আসছিল। মনোহরের দল ভেঙে গেছিল। এখন হারাধনকে ছেড়ে থাকতে পারতনা সে এক মুহূর্ত। কিন্তু বিচক্ষণ মনোহর তার পেশার কথা গোপন করেছিল; ছেলের কাছে। তাই শেষ জীবনে সে চাষবাস করে আর জমিতে লোক খাটিয়ে; চাষীর মতো জীবন কাটাতো। মনে অনুতাপও জন্মেছিল তার।

মৃ’ত্যুর আগে, পাওয়া গুপ্তধনের নাম করে; ছেলেকে তিন ঘড়া মোহর আর সোনা-রুপো দিয়ে যায় মনোহর। আর অনুরোধ করে, তার মৃত্যুর পরে এই এলাকায় যেন; হারাধন কয়েকটা দিঘি আর পুকুর কাটিয়ে দেয়। কারণ ওই সময়ে এই এলাকায়; গরমের সময় খুব জলকষ্ট ছিল। বাবার মৃত্যুর পরে, হারাধন সব কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিল। নাম মনোহরপুকুর। মনোহরপুকুর সংলগ্ন এলাকায়; বেশ কয়েকটি বড়ো পুকুর ও দিঘি কাটিয়ে দিয়েছিল সে। আজ সেগুলোর অনেকগুলো বুজে গেছে; আর কয়েকটা অসংস্কৃত অবস্থায় আছে।

আজকে মনোহরও নেই; আর হারাধনও নেই। কিন্তু তাদের স্মৃতি ও কীর্তি অমর করে রেখেছে; সাউথ কলকাতার একটি রাস্তা; যার নাম মনোহরপুকুর রোড। গল্প জানার পর এবার ঘুরে দেখে আসুন; সেই রাস্তা আর মন্দিরটি। (গল্প সোশ্যাল মিডিয়া থেকে প্রাপ্ত)

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন