উত্তরপ্রদেশের কাশী বিশ্বনাথ আছেন বাংলার কাশী ‘শিবনিবাস’-এও

4844
উত্তরপ্রদেশের কাশী বিশ্বনাথ আছেন বাংলার কাশী 'শিবনিবাস'-এও
উত্তরপ্রদেশের কাশী বিশ্বনাথ আছেন বাংলার কাশী 'শিবনিবাস'-এও

বাংলাতেও কাশী আছে; যার নাম ‘শিবনিবাস’। উত্তরপ্রদেশের কাশী বিশ্বনাথ আছেন; বাংলার কাশী ‘শিবনিবাস’-এও। পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলায় বাংলাদেশ বর্ডারের কাছে; চূর্ণী নদীর তীরে এক অদ্ভুত শহর ‘শিবনিবাস’। একদা নদিয়া রাজপরিবারের রাজধানী এই শহর; ধীরে ধীরে তার অতীত জৌলুস হারিয়ে ফেলেছে। ‘বাংলার কাশী’ হিসেবে পরিচিত, এই স্থানে স্থানীয় লোকজন ছাড়া; পর্যটক সমাগম খুব কম। অথচ এখানেই আছে বাংলা তথা পূর্বভারতের; সবচেয়ে বড় কষ্টি পাথরের শিবলিঙ্গ। শুধু উত্তরপ্রদেশ নয়; বাংলাতেও আছে কাশী বিশ্বনাথ।

লোককথা অনুযায়ী, একদা কাশীর বিশ্বনাথ শিব; মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে স্বপ্নাদেশ দেন; তিনি কাশী ছেড়ে তার রাজধানীতে থাকতে চান। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ভগবান শিবকে খুশি করতে; এখানে ১০৮ শিবমন্দির ও রাজপ্রসাদ নির্মাণ করেন। এবং তাঁর রাজধানী স্থানান্তর করে; শিবের নামে জায়গাটির নাম নেন শিবনিবাস।

আরও পড়ুনঃ নবাব আলীবর্দির দরবারে গিয়ে, উলেমা-মৌলবিদদের হারিয়ে এসেছিলেন পন্ডিত জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন

যদিও ইতিহাসবিদদের বিশ্লেষণ; এক্ষেত্রে একটু ভিন্ন। তাদের মতে রাজার রাজধানী স্থাপনের কারণ প্রশাসনিক; ধর্মীয় নয়। বর্গী আক্রমণের ভয়ে মহারাজ তড়িঘড়ি এখানে রাজধানী স্থানান্তর করেন; ভৌগলিক দিক দিয়ে শিবনিবাস, তিন দিক থেকে চূর্ণী নদীর দ্বারা বেষ্টিত। অন্যদিকটিতে মহারাজ একটি খাল, যেটি কঙ্কণা খাল নামে খ্যাত; খনন করে, রাজধানীকে আরও সুরক্ষিত করে তোলেন।

বর্গী মারাঠাদেরও আরাধ্য দেবতা মহাদেব; সেটিও ১০৮ শিবমন্দির নির্মাণের নেপথ্যের কারণ হতে পারে; বলে মনে করেন অনেক ঐতিহাসিক। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পুত্র শিবচন্দ্রের নাম থেকেই; জায়গাটির নাম শিবনিবাস হয়েছে বলে তাদের ধারণা। স্থানীয় অনেকের মতে, পূর্বে এই জায়গায় ডাকাতদের আধিপত্য ছিল; মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র সেই ডাকাতদের দমন করে; নদীর তীরে শিবির করে রাত্রিবাস করেন। এরপরেই মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র এখানেই; রাজধানী স্থাপন করেন।

Kashi Bishwanath Uttar Pradesh Bengal Kashi Shibnibas
উত্তরপ্রদেশের কাশী বিশ্বনাথ আছেন বাংলার কাশী 'শিবনিবাস'-এও

১০৮টি শিবমন্দিরের যে তিনটি এখনও অবশিষ্ট আছে; তার দুটি শিবমন্দির এবং একটি রামসীতা মন্দির। সর্ববৃহৎ মন্দিরটি হল রাজরাজেশ্বর মন্দির; স্থানীয়রা একে বুড়ো শিবের মন্দিরও বলেন। ১৭৫৪ সালে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র, তার প্রথম স্ত্রী রাজেশ্বরী দেবীর জন্য; এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন। এই মন্দিরটি বাংলার কোন প্রচলিত; মন্দির রীতির মধ্যে পড়ে না। উঁচু বেদির উপর নির্মিত, অষ্ট-কোনাকৃতি মন্দির চূড়ার উচ্চতা; ভূপৃষ্ঠ থেকে ১২০ ফুট। এই মন্দিরের ভিতরে রয়েছে; পূর্ব ভারতের সবচেয়ে বড় শিবলিঙ্গ। উচ্চতা ৯ ফুট এবং বেড়ে প্রায় ২১ ফুট। এত উচ্চতার দরুন, ভক্তদের দুধ-জল ঢালার জন্য; সিড়ি দিয়ে একটি উঁচু বেদি করা আছে।

দ্বিতীয় শিবমন্দিরটি মহারাজা তাঁর দ্বিতীয় পত্নী; রাগেশ্বরি দেবীর জন্য নির্মাণ করেন। উঁচু বেদির ওপর চতুস্কন এই মন্দিরটির গঠনশৈলী; ঠিক প্রথম মন্দিরটির মতই। এর ভিতরও একটি বৃহৎ শিবলিঙ্গ আছে; যদিও তার উচ্চতা প্রথম মন্দিরের চেয়ে কিছুটা কম, ৭ ফুট। মন্দিরগুলির গায়ে কোন টেরাকোটার কাজ নেই; তবে অনেক কোটর রয়েছে; যেখানে টিয়া পাখিদের আনাগোনা দেখতে পাওয়া যায়।

আরও পড়ুনঃ ইতিহাসে পড়ানো হয় না, আফগানদের পরাজিত করে ভারত ভূমি রক্ষা করেছিলেন নাগা সন্ন্যাসীরা

মন্দিরের সামনের মাঠে ভীম একাদশী থেকে শিবরাত্রি পর্যন্ত; বিশাল মেলা বসে। মন্দির প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় মন্দির পেরিয়ে পড়বে; রামসীতা মন্দির। ১৭৬২ সালে নির্মিত; অপূর্ব এই মন্দিরটির উচ্চতা ৫০ ফুট। ভিতরে কষ্টিপাথরে রাম; অষ্টধাতুর সীতার মূর্তি রয়েছে। তবে মন্দিরটিতে ফটোগ্রাফি করা; কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

কলকাতা থেকে, বাংলার কাশী, শিবনিবাস এর দূরত্ব; পরায় ১২০ কিমি। কৃষ্ণনগর থেকে ২৫ কিমি দূরে, ট্রেনে গেলে শিয়ালদা থেকে গেদে লোকালে; আড়াই ঘন্টার পথ মাজদিয়া স্টেশন; সেখান থেকে অটো রিকশায় বা টোটোতে ৩ কিমি পথ শিবনিবাস। যেতে সময় লাগবে ১০ মিনিট; ভাড়া ১৫ টাকা। এছাড়া তারকনগর স্টেশন থেকেও; টোটো-অটোতে আরও কম সময়ে; মন্দিরে পৌঁছান যায়। পথে আপনাকে চূর্ণী নদীর ওপর বাঁশের ব্রিজ পেরিয়ে; মিনিট দশেক হেঁটে মন্দির যেতে হবে।

এছাড়া কৃষ্ণনগর স্টেশন থেকে; বাস বা প্রাইভেট গাড়িতে আসা যায়। বর্তমানে পাকা ব্রিজ হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা; অনেক সুগম হয়ে গেছে। নীল-সাদা সেতুটি পেরিয়ে একটু গেলেই; বাঁদিকে মন্দির যাওয়ার পথ পেয়ে যাবেন। তাহলে দেরি না করে, একদিনের টুরে ঘুরেই আসুন বাংলার কাশী শিবনিবাসে; দেখে আসুন কাশী বিশ্বনাথকে।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন