মহারাজের গোপন অভিসারে ভারতের মানচিত্র বদলে, রাজপুতানা চলে যাচ্ছিল পাকিস্তানে

2300
মহারাজের গোপন অভিসারে ভারতের মানচিত্র বদলে, রাজপুতানা চলে যাচ্ছিল পাকিস্তানে
মহারাজের গোপন অভিসারে ভারতের মানচিত্র বদলে, রাজপুতানা চলে যাচ্ছিল পাকিস্তানে

গল্প হলেও সত্যি! মহারাজের এক গোপন অভিসারে ভারতের মানচিত্র বদলে; রাজপুতানা চলে যাচ্ছিল পাকিস্তানে। যোধপুরের মহারাজ হনবন্ত সিং ছিলেন; একজন আদর্শ প্রেমিক। কুড়ি বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয়; ধ্রাঙ্গাধ্রার এর রাণী কৃষ্ণা কুমারীর সঙ্গে। ১৯৪৮ সালে তিনি প্রেমে পড়েন; সান্দ্রা ম্যাকব্রাইড নাম্নী এক স্কটিশ নার্সের; তাঁরা পরিণয়াবদ্ধ হন, যদিও সেই পরিণয় স্থায়ী হয়নি। মহারাজ সত্যিকারের ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছিলেন; অনিন্দসুন্দরী চিত্রাভিনেত্রী জুবেদার মধ্যে।

জুবেদার সঙ্গে তাঁর দেখা হয় মুম্বইতে; এক পোলো টুর্নামেন্টের সময়। মহারাজ জুবেদাকে হিন্দুমতে বিয়ে করেন; জুবেদার নতুন নাম হয় বিদ্যা রাণী রাঠোর। এঁদের প্রেম কাহিনী নিয়েই ভবিষ্যতে জুবেদার প্রথম বিবাহের সন্তান; খালিদ মহম্মদ ‘জুবেইদা’ নামে একটি সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখেন। যার পরিচালনা করেন প্রথিতযশা চিত্রপরিচালক শ্যাম বেনেগাল; যে সিনেমায় নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন; করিশ্মা কাপুর ও মনোজ বাজপেয়ী।

আরও পড়ুনঃ বাংলার বর্ধমানের গৃহবধূ কিভাবে হয়েছিলেন অখণ্ড ভারতের শাসক

কিন্তু ১৯৪৭ এ, যোধপুরের মহারাজ হনবন্ত সিং এর এক গোপন অভিসারের ফলে; ভারতের মানচিত্র বদলে যেতে বসেছিল। ১৯৪৭ এ যখন ঠিক হয় দেশীয় রাজ্যগুলো, হয় ভারতীয় ইউনিয়ন অথবা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবে। তখন মহারাজ সটান মহম্মদ আলি জিন্নাহর; দিল্লির ঔরঙ্গজেব রোডের বাড়িতে এসে হাজির হন। আসল উদ্দেশ্য; পাকিস্তানে যোগ দেওয়া। আসলে কংগ্রেসে মহারাজের ব্যক্তিগত; আপত্তি ছিল। মহারাজের কথা শুনে; জিন্নাহ তো মহাখুশি। রাজামশাইকে একটা সাদা কাগজ ধরিয়ে বললেন; “আপনার কি চাই লিখে দিন; আমি সই করে দিচ্ছি”।

এদিকে সর্দার পটেল এবং তাঁর সচিব ভি পি মেনন অবশ্য; চুপ করে বসে ছিলেন না। মহারাজের এই অভিসারের খবর; পটেল আর মেননের কাছে গুপ্তচর মারফত ঠিকই পৌঁছেছিল। তাই মহারাজ জিন্নাহর বাড়ি থেকে বেরোতেই; মুখোমুখি হলেন ভি পি মেননের। মেনন মহারাজকে জানালেন; লর্ড মাউন্টব্যাটেন রাজার সঙ্গে দেখা করতে চান। অবশ্য এটা ছিল একটা ধাপ্পা, কেননা মাউন্টব্যাটেনের নাম না করলে; মহারাজকে নড়ানো যেত না। মেনন রাজাকে গভর্নর হাউসে (এখন রাষ্ট্রপতি ভবন) নিয়ে গিয়ে; সেখানে বসিয়ে তড়িঘড়ি গেলেন মাউন্টব্যাটেনের কাছে।

আরও পড়ুনঃ ভারতীয় সেনার প্রেমে সুইজারল্যান্ড তরুণী, সাবিত্রীর ভারত প্রেম ও পরমবীর চক্র

সেখানে বড়লাটকে জানালেন; মহারাজের পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার ইচ্ছে। কিন্তু যোধপুর ও রাজপুতানা সব হিন্দুপ্রধান রাজ্য; এরা পাকিস্তানে যোগ দিলে বড় আকারের সমস্যা; এমনকি রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। মাউন্টব্যাটেন সঙ্গে সঙ্গে রাজার কাছে গিয়ে; এইরকম হঠকারিতা করতে বারণ করলেন। মহারাজও ছেড়ে দেওয়ার; পাত্র নন। তিনি বললেন, “জিন্নাহ আমায় সাদা কাগজে সই করে দিয়েছেন; আপনারা কি দেবেন?”

মেনন উত্তর দিলেন, “সাদা কাগজ যত চান দিতে পারি; কিন্তু মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেব না”। মাউন্টব্যাটেনের মধ্যস্থতায় ঠিক হল, মহারাজ আপাতত অঙ্গীকারপত্রে সই করবেন; তিনদিন পর মেনন যোধপুর গিয়ে পাকা দলিল নিয়ে আসবেন। এদিকে রাজামশাই ততক্ষণে বুঝতে পেরেছেন, লর্ড মাউন্টব্যাটেন মোটেও তাঁকে ডাকেন নি; ওসব মেননের ভাঁওতা। মাউন্টব্যাটেন একটি কাজে সাময়িকভাবে ঘর থেকে বেরোতেই; মহারাজ একটি পিস্তল বের করে মেননকে ধমকি দিতে শুরু করলেন। ইতিমধ্যে মাউন্টব্যাটেন ফিরে এসে হতবাক! সঙ্গে সঙ্গে তিনি; পিস্তলটি কেড়ে নেন।

আরও পড়ুনঃ সম্পূর্ণ হিন্দু রীতিতে কলকাতায় নারী শিক্ষার স্কুল খুলেছিলেন, ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মী বাইয়ের আত্মীয়

তিনদিন পর মেনন যোধপুরে গিয়ে দেখেন; প্রাসাদের বাইরে এক বিশাল জনতা তাঁর আর কংগ্রেসের শ্রাদ্ধ করছে। পুলিশ এসে তাঁকে; প্রাসাদের ভিতরে ঢোকায়। মহারাজ সাদরে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলেন; “শুধু কংগ্রেস নয়; আমরাও বিক্ষোভ করতে পারি”। দলিলপত্র সইসাবুদ হয়ে গেল; শান্ত হলেন মহারাজ। এবার মহারাজ মেননকে বললেন, “আজ আমি হেরে গিয়েছি, তুমি জিতেছ; আজ আমাকে মদ খেতেই হবে”।

হুইস্কি আর সোডা এল; মদ চলতেই লাগল। শেষে মেনন বললেন; আর পারছেন না। মহারাজ বললেন, “ঠিক আছে; এবার আমরা শ্যাম্পেন খাব”। বোতলের পর বোতল; শ্যাম্পেন আসতে লাগল। তবে ততক্ষণে মেনন কাত; দলিল পকেটে নিয়ে দিল্লি ফিরতে পারলে বাঁচেন। এরপর রাজা হুকুম দিলেন, মহাভোজের আয়োজন করতে; তার সঙ্গে ব্যান্ড পার্টি আর সুন্দরী মেয়েদের নাচ। এদিকে মেনন বোঝাতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন; যোধপুরের ভারতে যোগ দেওয়ার তাৎপর্য কি!

আরও পড়ুনঃ মহিলার সম্মানরক্ষায় মুখ্যমন্ত্রীর ছেলেকে গাড়ির পেছনে বেঁধে এনেছিলেন বাঙালি কর্নেল

কয়েক ঘন্টা এইসব চলার পর, মহারাজের ইচ্ছা হল; তিনি নিজে প্লেন চালিয়ে মেননকে দিল্লিতে পৌঁছে দেবেন। ছয় সিটের বীচক্র্যাফট বোনাজা প্লেনটি, রাজা এত জোরে চালিয়েছিলেন যে; মেননের মাথা ঘুরছিল। দিল্লিতে নেমে মেনন; রীতিমতো অসুস্থ বোধ করছিলেন। তবে তাঁর পকেটে যোধপুরের; ভারতে যোগ দেবার দলিলটি অক্ষত ছিল। এবং সবচেয়ে বড় কথা তিনি; যোধপুরের পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তি বন্ধ করতে পেরেছেন। কেননা যোধপুর পাকিস্তানে যোগ দিলে; বাকি রাজপুত রাজ্যগুলির যোধপুরের পদাঙ্ক অনুসরণ করার; প্রবল সম্ভাবনা ছিল। রাজপুতানাকে ভারতে রাখার কৃতিত্ব; একা ভি পি মেননের।

মেননের ভাগ্য খুব ভালো ছিল; বলতে হবে। পাঁচ বছর পর, ১৯৫২ সালের ২৬ শে জানুয়ারী; ঐ বীচক্র্যাফট বোনাজা বিমানে করে দিল্লি যাওয়ার সময়; এক দুর্ঘটনায় মহারাজ হনবন্ত সিং আর জুবেদার দেহাবসান ঘটে। সেবারও প্লেন চালাচ্ছিলেন মহারাজ।(তথ্যসূত্র: ‘ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ রাজত্বের শেষ দশক’; দীপঙ্কর মুখোপাধ্যায়)।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন