বাংলার বুকে, ভুতে ধরার আশঙ্কায় চার শিশুকে কি করা হল

763
বাংলার বুকে, ভুতে ধরার আশঙ্কায় চার শিশুকে কি করা হল/The News বাংলা

চিকিৎসা নয়, ওঝার ঝাড়ফুকেই প্রাণ গেল দুই শিশুর। ঠিক সময়ে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে হয়তো; প্রাণে বেঁচে যেত দুই শিশু। যদি না ওঝার খপ্পরে পড়ত। ওঝার ঝাড়ফুকেই প্রাণ হারাল; দুই খুদে। এমনই এভাবেই একুশ শতকেও; কুসংস্কারের বলি দুই। মালদার গাজলের কদমতলার ঘটনা। বাংলার বুকে ; ভুতে ধরার আশঙ্কায় চার শিশুকে যা করা হল; শুনে চমকে উঠল গোটা সমাজ। ভুতে ধরার আশঙ্কা করে চার ক্ষুদে শিশুর ওপর রাতভোর গুনিন-ওঝা দিয়ে ঝাড়ফুঁকের চালানোর অভিযোগ অভিভাবকদের। আর তার পরেই দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় শোরগোল পড়ে গিয়েছে মালদার গাজোল থানার কদমতলী এলাকায়। পাশাপাশি আরো দুই শিশুকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ভর্তি করানো হয়েছে মালদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে।

শুক্রবার রাতে এই ভয়ঙ্কর ঘটনাটি ঘটেছে গাজোল থানার আলাল গ্রাম পঞ্চায়েতের কদমতলী গ্রামে। ভুতে ধরেছে শিশুদের ! যার কারণে এই শিশুদের মৃত্যু হয়েছে, এমনই আতঙ্ক এখন কদমতলী গ্রামের বাসিন্দাদের মনে বসে গেছে। অনেকেই ভূতের ভয়ে বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ করে দিয়েছেন।

এদিকে পুরো বিষয়টি জানতে পেরে রীতিমতো হতবাক হয়ে পড়েছেন গাজোলের তৃণমূল বিধায়ক দিপালী বিশ্বাস। শিশু মৃত্যুর খবর পেয়েই শনিবার সকালেই মালদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অসুস্থ দুই শিশুকে দেখতে আসেন বিধায়ক দিপালী বিশ্বাস। কথা বলেন পরিবার লোকেদের সঙ্গে।

এরকম কুসংস্কার যাতে গ্রামবাসীদের মধ্যে না ছড়ায় তা দেখতে শনিবার ওই গ্রামে যান বিধায়ক দিপালী বিশ্বাস। কি কারণে শিশুদের হঠাৎ করে মৃত্যু হলো সেব্যাপারেও পুলিশ ও প্রশাসনকে খতিয়ে দেখার কথা বলেন বিধায়ক।

পাশাপাশি একটি মেডিক্যাল টিম ওই গ্রামে পাঠানো হচ্ছে বলে মালদা স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে। তারা পরীক্ষা করে দেখবেন; আর কোন শিশুর শরীর খারাপ হয়েছে কিনা।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত দুই শিশুর নাম সফিকুল আলম (৫), ফিরোজ রহমান (৭)। মেডিকেল কলেজে অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসারত রয়েছে কোহিনুর খাতুন (৬), শাবনুর খাতুন (৩)। এরা দুই বোন।

প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে কদমতলী গ্রামের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে একটি জঙ্গলের মধ্যেই ওই চার শিশু খেলা করছিল। এরপরই হঠাৎ শুক্রবার সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে শিশুরা অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ওদের মুখ দিয়ে গ্যাজলা বেড়তে থাকে।

এতেই পরিবারের লোকেদের ধারণা হয় যে ওই শিশুদের ভুতে ধরেছে। এরপরই গুনিন-ওঝাদের এনে ঝাড়ফুঁক শুরু করে পরিবারের লোকেরা। দীর্ঘক্ষন শিশুদের নিয়ে চলে নানানভাবে ঝাড়ফুঁকের কাজ। অবশেষে কোন পরিনাম না মেলায় তাদের নিয়ে আসা হয় মালদা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে। পথেই মৃত্যু হয় সফিকুল আলম নামে এক শিশুর। এরপরই মেডিকেল কলেজের চিকিৎসারত অবস্থায় ফিরোজ রহমানের মৃত্যু হয়। 

অসুস্থ কোহিনুরের মামা আসিফ শেখ বলেন, “গ্রামে ভূতের তান্ডব শুরু হয়েছে। শিশুদের ওপর ভর করছে ভূত। যার কারণে এই দুই শিশু মারা গিয়েছে। আমার দুই ভাগ্নি ভূতের খপ্পরে পড়ে এখন আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন মেডিকেল কলেজে। চারজন শিশুকে রাতে ঝাড়ফুঁক করানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু দুইজনকে বাঁচানো যায় নি”।

এর আগেও এই গ্রামের বেশ কিছু মানুষকে ভুতে ধরেছিল; বলে জানিয়েছে গ্রামবাসীরা। কয়েকজন মারাও গিয়েছে; বলেই খবর। তারা এখন আতঙ্কিত । কদমতলী গ্রামে ভূত তাড়ানোর কি উপায় আছে সেটাই প্রশাসনের কাছে জানতে চায় গ্রামবাসীরা।

এদিকে এরকম ঘটনা শুনে হতবাক বিধায়ক দিপালী বিশ্বাস। তিনি বলেন, “ওই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে এরকম যে কুসংস্কার রয়েছে তা জানা ছিল না। আমি কদমতলী গ্রামে গিয়েছি। ওখানকার মানুষদের বুঝিয়েছি ভূত বলে কিছু হয় না । সবই কুসংস্কার। সঠিক সময়ে চিকিৎসা পেলে হয়তো শিশুরা প্রাণে বেঁচে যেত। জানি না ওদের পরিবার কেন এরকমটা করলো। স্থানীয় ব্লক স্বাস্থ্য ও প্রশাসনকে বলেছি শিশু মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে জানার জন্য সঠিকভাবে তদন্ত করতে। নইলে গ্রামবাসীদের একাংশের মধ্যে এরকম ভ্রান্ত ধারণা থেকেই যাবে”।

যদিও মেডিকেল কলেজ কর্তব্যরত চিকিৎসক ও পুলিশ প্রাথমিক তদন্তের পর জানিয়েছে,  “জঙ্গলে খেলার সময় হয়ত বিষাক্ত কোন ফল শিশুরা খেয়ে ফেলেছিল। যার কারণে শরীরে দ্রুত বিষক্রিয়ার প্রভাব পড়ে থাকতে পারে। আর তা থেকেই এই ঘটনাটি ঘটেছে। কিন্তু গ্রামবাসীদের একাংশ ভুতের কথা বলেই আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করছে”। যদিও মৃত ওই দুই শিশুর ময়নাতদন্তের পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে জানা যাবে বলে জানিয়েছেন গাজোল থানার পুলিশ।

চিকিৎসা নয়, ওঝার ঝাড়ফুকেই প্রাণ গেল দুই শিশুর। ঠিক সময়ে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে হয়তো; প্রাণে বেঁচে যেত দুই শিশু। যদি না ওঝার খপ্পরে পড়ত। ওঝার ঝাড়ফুকেই প্রাণ হারাল; দুই খুদে। এমনই এভাবেই একুশ শতকেও; কুসংস্কারের বলি দুই। মালদার গাজলের কদমতলার ঘটনা। মালদহের গাজলের ওই দুই শিশু; বাইরে খেলছিল। বাড়ি ফিরে এসে; তারা জানায় তারা অসুস্থ বোধ করছে। বাড়ির পরিজনেরা মনে করে; করে ওই চার শিশুকে ভুতে ধরেছে তাই এমন অদ্ভুত আচরণ করছে। তাদের হাসপাতালে না নিয়ে গিয়ে ওঝা ডাকেন তারা।

এরপরেই ওঝা এসে; ওই চারজনকে বন্ধ ঘরে ঢুকিয়ে শুরু হয় ঝাড়ফুক। তাদের মালদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য; নিয়ে যাওয়া হলে দুজন শিশুর মৃত্যু হয়। বাকি দুজন এখনও; আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। জানা গিয়েছে; ফিরোজ রহমান এবং শফিকুল আলমের দেহ তাদের পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

ফিরোজ রহমান এবং শফিকুল আলম নামে নিহত ওই দুই শিশুর দেহ পরিজনদের হাতে তুলে দেবেন; চিকিৎসকরা। ঝাড়ফুকের কথা স্বীকারও করে নেন; মৃত শিশুদের পরিবার। মালদহের কদমতল এলাকা সংখ্যালঘু অধুষ্যিত। সেখানে ক্রমশ বেড়ে চলা কুসংস্কার থেকেই; এমন মর্মান্তিক ঘটনা বলে জানা গিয়েছে।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন