রাম-এর আবিষ্কর্তা কোনও দিন মদ চেখেও দেখেননি

2505
রাম-এর আবিস্কর্তা কোনও দিন মদ চেখেও দেখেননি/The News বাংলা
রাম-এর আবিস্কর্তা কোনও দিন মদ চেখেও দেখেননি/The News বাংলা

রাম-এর আবিস্কর্তা কোনও দিন মদ চেখেও দেখেননি। ইউথ হোক বা প্রৌঢ় মদ্যপানে নেশা না হলে; ব্যাপারটা ঠিক জমেনা। তাই মদ্যপায়ীদের নেশার জন্য পছন্দের তালিকায় প্রথমেই থাকে রাম। যার মধ্যে বুড়ো সন্ন্যাসী থুড়ি; ওল্ড মংক গলা ভেজানোর পানীয়ের তালিকায় শ্রেষ্ঠ জায়গায় বিরাজ করে। ইয়াং জেনারেশন হোক বা একটু বয়স্ক যারাই নেশা করতে ভালবাসেন; পছন্দের মদের কথা জিজ্ঞেস করতে সবার আগে তাদের মুখে উঠে আসবে রামের কথা। অথচ অতি যত্নে যিনি এই ওল্ড মংক বানিয়েছেন; তার আবিষ্কর্তা কোনও দিন মদ চেখেও দেখেননি। সেই কপিল মোহন নিজে কোনও দিন মদ ছুঁয়েও দেখেননি।

ওল্ড মংকের প্রতিষ্ঠাতা কপিল মোহন (১৯৪০-২০১৮) মারা যান গাজিয়াবাদে। বয়স হয়েছিল বেশ তবে চেষ্টা করতেন শেষ অবধি বাজারি চটকদার; বহুল বিজ্ঞাপিত সিন্থেটিক সুরার সঙ্গে পাল্লা দিতে রোজ। দাঁতে দাঁত চেপে রাম বানিয়ে গেছেন; বিশ্বস্ত মদ্যপায়ীদের জন্য। নিজে কিন্তু না সিগারেট খেতেন না মদ। আজ চলুন এর জানা-অজানা গল্প জেনে নিন।

আরও পড়ুন নৈহাটির বিস্ফোরণ স্থলে নমুনা সংগ্রহে ফরেন্সিক দল

জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডে কুখ্যাত জেনারেল ডায়ারের বাবা ছিলেন; এডমন্ড এব্রাহাম ডায়ার। ১৮২০ সালে ব্রিটেন থেকে; মদ তৈরির যন্ত্রাদি নিয়ে হিমাচলের কসৌলে আসেন; ব্রিওয়ারি খুলবেন বলে। এশিয়ার প্রথম ডিস্টিলারি খোলেন। নাম রাখেন কসৌল ডিস্টিলারি কোম্পানি। পরে আর এক সাহেব এইচ.জি ম্যেকিন কিছু শতাংশ শেয়ার কিনে নেন। পাহাড় রাজ্যের কোলে গড়ে ওঠা; ঝরনা জল দিয়ে তৈরি সুরা কারখানার নাম রাখেন ডায়ার ম্যেকিন ব্রিওয়ারি।

স্বাধীনতার পরে হাত বদল হয়ে এই কোম্পানি আসে সজ্জন ব্যক্তি নরেন্দ্রনাথ মোহনের হাতে। লন্ডনে গিয়ে ডিস্টিলারির বেশির ভাগ অংশীদার হন ইনি। হিমাচল, উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্রতে একাধিক কারখানা গড়ে তোলেন; তবে শ’ওয়েলেসের ধারে কাছে আসতে পারেনি ব্যবসা। আসে তার মৃত্যুর পর। ছোট ছেলে কপিল মোহন বাজারে আনেন; এক অমৃত পানীয়। স্বদেশী, স্বাদু, সহজলভ্য। সেদিন ছিল ১৯ ডিসেম্বর, ১৯৫৪।

আবিষ্কার হল খুব গভীরভাবে তাকিয়ে থাকা লাল ঘোলাটে রাম। এক পেটমোটা তেলের শিশির মত বোতলে। দাবিদাওয়াহীন আটপৌরে স্ত্রী এর মত। জল মিশিলেও চলে; তবে সাথে স্বচ্ছ বরফ কুচি, কোলা, ঠান্ডা জল হলে কিছু রাতে আদর বাড়ে। গ্নাসের গায়ে জলের বিন্দু। ঠোঁটে লাগা ঠান্ডা; অল্প যদিও। বাকিটা অতল খোঁজা। আরো গভীরতর। বাদামের একটা টুকরো গেলাসের নিচে পড়ে থাকে যেমন। রাম, জল, বরফ, চুমুক এর নিচে, অস্থিরতায়। তার ও নিচে। আরো অতল খোঁজার আকুতি। ওল্ড মংক শেখালো। ওল্ড মংক তৈরি হয় ভেলি গুড় থেকে।

ভেলি গুড়ে ঝরনার জল মিশিয়ে; তা ফেলে রাখা হয়। সাধারণভাবে; পচতে দেওয়া হয় জল হাওয়ায়। এরপর এতে মিশিয়ে দেওয়া হয় yeast। এটি এখনও ব্রিটিশ বন্য yeast হলেই ভাল। গ্যাঁজানো দরকারি ফ্লেবার মেশাবার আগে। মংকে মেশানো হয়; ভ্যানিলা আর ডিস্টিল করা হয় চারকোলের মাঝে। এই ভ্যানিলা ও কাঠকয়লার মিশেল এটিকে উষ্ণ কিন্তু স্মোকি করে তোলে। এরপর একে ঢালা হয়; Oak Barrel এ। সাত বছরের জন্য কালকুঠুরি তে বন্দি করে।

এক বিরল ঔদ্ধত্য নিয়ে এর বিপণন বিভাগ চলতো। ৭০ বছরে একবার ও ওল্ড মংকের কোন বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়নি কোথাও। মোহন বাবু এটি অর্থ-অপচয় ভাবতেন। এর চেয়ে মদের দাম সস্তা রাখা ও ভারতবর্ষকে এর স্বাদে আচ্ছন্ন করে তুলে; উনি বেশি আগ্রহী ছিলেন। আজও হয়তো সে কারণে ওল্ড মংক কেবল একটি ব্র‍্যান্ড নয়; একটা অনুভূতি; একটা ভালোলাগা মন্দ লাগার বন্ধু হয়ে থেকে গেছে। অনেকেই আছেন; যারা সিংগল মল্ট ছেড়ে ওল্ড মংক খান। সন্ধে নামলেই। প্রতিদিন।

হয়তো সে কারনেই, ওল্ড মংককে জাতীয় পানীয় হিসেবে ঘোষণা করার অবাক প্রস্তাব দিয়েছিল কিছু সংগঠন। গৃহীত হয়নি; তবে গেলাসে গেলাসে আজ ও বিপ্লব জারি আছে। মুম্বাইতে একটা গোটা গোষ্ঠী আছে রামভক্তদের। নাম COMRADES — Council of Old Monk Rum Addicted Drinkers and Eccentrics! এরা প্রতি সন্ধে দেখা করে ঠেক এ, দু তিন পেগ খায়, নানা গল্প বিতর্ক হয়; শেষে যে যার বাড়ি চলে যায়। ইদানীং রামভক্তের সংখ্যা দেশে বৃদ্ধি পেলেও;

উইস্কিভক্তিই বাজার দাপাচ্ছে। রামের গেলাস কমই রোচে। নতুন ইচ্ছে, বিরাট স্বপ্ন দেখা, আইফোন, লম্বা গাড়ির সাথে পাল্লা দিতে; সৌখিন স্কচ বা টেনেসি প্রয়োজন। রাম বড্ড মধ্যবিত্ত; সেকেলে শুনেছি। হয়তো সেকারণেই বাজার থেকে সম্পূর্ণ উবে যাওয়ার আগে; জোর টক্কর দিচ্ছে মংক। ভালোলাগার মংক।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন