নবাব আলীবর্দির দরবারে গিয়ে, উলেমা-মৌলবিদদের হারিয়ে এসেছিলেন পন্ডিত জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন

5390
নবাব আলীবর্দির দরবারে গিয়ে, উলেমা-মৌলবিদদের হারিয়ে এসেছিলেন পন্ডিত জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন
নবাব আলীবর্দির দরবারে গিয়ে, উলেমা-মৌলবিদদের হারিয়ে এসেছিলেন পন্ডিত জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন

নবাব আলীবর্দির দরবারে গিয়ে, তাঁর উলেমা-মৌলবিদদের হারিয়ে এসেছিলেন; বাংলার পন্ডিত জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন। নবাবী আমলে বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পন্ডিত ছিলেন; ত্রিবেণীর জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন। অত্যন্ত জ্ঞানী মানুষ, অত্যন্ত সম্মানিতও; শুধু ভারতীয় মহলেই নয়‚ ব্রিটিশ মহলেও তাঁর খ্যাতি ছিল তুঙ্গে। খোদ রবার্ট ক্লাইভ তাঁর কাছে; সংস্কৃত টিউশন নিতেন। এছাড়াও লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস, হার্ডিঞ্জ, জন শোর, কোলব্রুক এবং এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা স্যার উইলিয়াম জোন্সের মত; বাঘা বাঘা ইংরেজদের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল। প্রাচ্য সংস্কৃতি বিশারদ পণ্ডিত জোনস বিভিন্ন তথ্য ও তত্ব সংগ্রহ করতে; বারবার তাঁর কাছে এসে ধর্ণা দিতেন।

এমনকি কলকাতায় প্রথম সুপ্রীম কোর্ট স্থাপিত হলে; তাঁকেই সেখানে প্রধান পণ্ডিতের পদ গ্রহণ করতে ডাকা হয়। কিন্তু তিনি সেই; পদ নেন নি। বদলে তার নাতি ঘনশ্যামকে; সেই পদে বসানো হয়। এছাড়া তৎকালীন পন্ডিতদের মধ্যে; তিনি অন্যতম ধনীও ছিলেন বটে। তার এই ধনসম্পত্তি সবই ছিল; পান্ডিত্যের জোরে উপার্জন করে নেওয়া। বিভিন্ন শাস্ত্রে পান্ডিত্য দেখিয়ে; নানা রাজা-নবাব-জমিদারদের থেকে দান পাওয়া সম্পত্তি।

আরও পড়ুনঃ কার্গিল নায়ক ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রা, একাই খ’তম করেছিলেন একাধিক পাক জ’ঙ্গিকে

যেমন‚ একটা উদাহরণ দেওয়া যায়। বর্ধমানের রাজা ত্রিলোকচন্দ্র বাহাদুর; জগন্নাথকে পাণ্ডুয়া পরগণার হেদুয়াপোঁতা গ্রাম; অনেক ব্রহ্মোত্তর জমি ও তিনশো বিঘার পুকুর দান করেছিলেন। কারণ জগন্নাথ তাঁর রাজ্যের পণ্ডিতদের; তর্কযুদ্ধে হারিয়ে দিয়েছিলেন। কি এক দিন ছিল বাঙালির; তর্কবিতর্ক করেও বিঘা বিঘা জমি পাওয়া যেত। আরেকবার কৃষ্ণনগরে কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি বাণেশ্বর; তুলসীদাসের একটা দোঁহা বাংলায় অনুবাদ করে নিজের নামে চালানোর ধান্দা করেছিলেন। জগন্নাথ সেই চুরি ধরিয়ে দিয়ে, কৃষ্ণচন্দ্রের থেকে উপহার পেয়েছিলেন; একশ স্বর্ণমুদ্রা আর একশ বিঘা জমি!

একবার স্বয়ং মুর্শিদাবাদের নবাব আলীবর্দি খাঁ; তাঁকে ডাক পাঠিয়েছিলেন তার রাজসভায়। নবাব আলীবর্দীর দেওয়ান নন্দকুমার ছিলেন; জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের শিষ্য। তিনি স্বভাব চরিত্রে ছিলেন; কিছুটা ‘বদমাশ’ ও ‘লাগানো-ভাঙানো’ ধরনের লোক। নবাব আলীবর্দীর সভায় মুসলিম উলেমা-মৌলবিদের আঁতে ঘা দেওয়ার জন্যে; তাদের সামনে তিনি প্রতিদিনই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে; জগন্নাথের বিশাল পান্ডিত্যের কথা বলতেন। কিন্তু কাঁহাতক আর একটা ‘কাফেরে’র নামে; এত ভালো ভালো কথা প্রতিদিন সহ্য হয়?

আরও পড়ুনঃ মথুরা ও সোমনাথ মন্দিরে বারবার জি’হাদি অভিযান চালায় সুলতান মামুদ

উলেমারা একদিন উঠল ক্ষেপে‚ আর তাদের চাপে পড়ে; নন্দকুমারকে নবাব আলীবর্দী নির্দেশ দিলেন; “ডাকো হে তোমার গুরুকে; হোক তর্ক আমার উলেমাদের সঙ্গে। দেখব কতবড় পন্ডিত সে”। বেচারা নন্দকুমার বুঝতেও পারেনি‚ নিতান্তই খেয়ালের বশে; আলীবর্দীর উলেমাদের সঙ্গে মজা করতে গিয়ে; নিজের গুরুদেবকে এভাবে বিপদে ফেলে দেবে। নবাবের মনে যে আসলে কি চলছে‚ জগন্নাথ তর্ক করতে গেলে; তাঁর হিন্দু শাস্ত্রীয় কথাবার্তা আদৌ এরা বুঝবে কিনা‚ অথবা তর্কে যদি হেরে যায়; তবে হিন্দু পন্ডিতদের মত উলেমারা ভদ্রভাবে হার স্বীকার করে নেবে কিনা; নাকি কোনো রক্তারক্তি কান্ড বাঁধিয়ে দেবে; এসব ভাবতে ভাবতেই নন্দকুমার জগন্নাথের কাছে গিয়ে হাজির।

নবাব ডাকে? তো চলো মুর্শিদাবাদ! মৃদু হেসে জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন; শিষ্যকে নিয়ে হাঁটা লাগালেন মুর্শিদাবাদের দিকে। যেদিন তিনি আলীবর্দীর স্বভায় গেলেন; সেদিন নবাবের রাজদরবারে লোক যেন আর ধরেনা। মুর্শিদাবাদের যাবতীয় মানুষ, সেদিন এসে উপস্থিত হয়েছিল; আলীবর্দীর তর্কসভা দেখতে। আর এতো আর নিছক কোনো তর্কসভা না; এ যে দেশের মান সম্মান রক্ষার চরমতম পরীক্ষা। কে বড়? ভারতের পণ্ডিত নাকি আরবের উলেমা? তাঁর নিষ্পত্তি হবে আজ।

আরও পড়ুনঃ ইতিহাসে পড়ানো হয় না, আফগানদের পরাজিত করে ভারত ভূমি রক্ষা করেছিলেন নাগা সন্ন্যাসীরা

যথারীতি তর্ক শুরু হল। হিন্দুধর্ম সংক্রান্ত যাবতীয় অস্বস্তিকর প্রশ্ন; মূর্তিপুজো‚ বহু ঈশ্বরবাদ ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশ্নে; আক্রমণ শুরু হল জগন্নাথকে। জগন্নাথও উলেমা মৌলবিদের নিজের ভাষায়; ধীরস্থির ভাবে সমস্ত উত্তর দিতে লাগলেন। ক্রমে লড়াই জমে উঠেছে! একদিক থেকে ধেয়ে আসছে প্রশ্নের পর প্রশ্ন; আর এপাশে ‘একা কুম্ভ’ হয়ে জগন্নাথ আগলে আছেন ভারতীয় গড়।

একসময় নবাব আলিবর্দী অবাক হয়ে দেখলেন; উলেমাদের প্রশ্ন ক্রমশঃ ধীরে ধীরে কমে আসছে। দু-একজন তর্কাতর্কি ছেড়ে “কই একটু শরবত দেরে”; বলে এদিক ওদিক সরে পড়েছে। কেউ আবার হাই তুলছে; কারও আবার চট করে মনে পড়ে যাচ্ছে; তাঁর তিন নম্বর বিবি সেদিন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে বলেছিল। এদিকে নবাবের সভায়; অবস্থা বেশ জটিল! সাধারণ মানুষের ভেতর; উত্তেজনা চরমে উঠেছে। এক এক করে মৌলবিদরা, নিজেদের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে বসে পড়েন; আর দর্শকেরা পেছন থেকে টিটকিরি দেয়।

আরও পড়ুনঃ পরাধীন ভারতে লোহার শিকলে গঙ্গা ঘিরে, ইংরেজদের জাহাজ চলা বন্ধ করেছিলেন রানী রাসমণি

নবাব আলীবর্দি বুদ্ধিমান মানুষ ছিলেন; মানুষ ও মাস সাইকোলজি সম্পর্কে হাড়ে হাড়ে জানতেন। মানুষের এই উৎসাহ সময় থাকতে থাকতেই; দমিয়ে দেওয়া ভাল। নয়তো দেশের গর্বে গর্বিত হিন্দুরা; উত্তেজনা সামলাতে না পেরে; না জানি কি করবে। তাই তাড়াতাড়ি করে তিনি জগন্নাথকে জয়ী ঘোষণা করে; ‘বাইশ শিরোপা’ দান
করলন; সঙ্গে দিলেন প্রচুর ধনসম্পত্তি। সঙ্গে নবাবের দান হিসাবে; হাতি ঘোড়া দিলেন। সেকালে নবাবের দান; বাজারে বেচা ছিল গর্হিত অপরাধ। কিন্তু এত হাতি ঘোড়াকে; খাওয়াবে কে?

কিন্তু জগন্নাথও কম বুদ্ধিমান ছিলেন না; নবাব তাঁকে কি উদ্দেশ্যে ডেকেছিলেন; আর কি উদ্দেশ্যে তাঁকে হাতি ঘোড়া দিয়েছেন; তা বুঝতে তাঁর মোটেও অসুবিধা হয়নি। তাই নবাবকে কিছুটা অপমান করার জন্যই; তিনি সভার ভেতরেই নবাবের দেওয়া উপহার থেকে হাতি-ঘোড়া এগুলোকে ফেরত দিয়ে দিলেন। কারণ একজন ব্রাহ্মণ নাকি; এসব ব্যবহার করতে পারে না। আর তারপর বাকি জিনিসপত্র নিয়ে, শিবিকা বোঝাই করে; পালকিতে চড়ে আবার নিজের বাড়ি ফেরত চলে এলেন; মুর্শিদাবাদ জয়ের পুরষ্কার হিসাবে। এই তথ্য কোন ইতিহাস বইয়ে না থাকলেও; বছরের পর বছর মানুষের মুখে মুখে চলে এসেছে।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন