‘গদিপ্রিয়’ রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী ও তাঁদের ‘অন্ধ তাঁবেদার’দের জন্য, বাংলায় বিপদে সাধারণ মানুষ

374
'গদিপ্রিয়' রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী ও তাঁদের 'অন্ধ তাঁবেদার'দের জন্য, বাংলায় বিপদে সাধারণ মানুষ
'গদিপ্রিয়' রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী ও তাঁদের 'অন্ধ তাঁবেদার'দের জন্য, বাংলায় বিপদে সাধারণ মানুষ

মানব গুহ, কলকাতাঃ ‘গদিপ্রিয়’ রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী ও তাঁদের তাঁবেদারদের জন্য; করোনা মহামারীর মধ্যে বিপদে, বাংলার সাধারণ মানুষ। কেউ বাকি নেই; কাকে ছেড়ে কার কথা বলবেন। শাসক দল তৃণমূল থেকে শুরু করে; প্রধান বিরোধী দল বিজেপি; বিরোধী দল সিপিএম কংগ্রেস; সবাই করোনা মহামারী বিধিনিষেধ ভাঙতে বদ্ধপরিকর। আর তাঁদের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে; তাঁদের অন্ধ তাঁবেদাররা। ফলে যা হবার তাই হয়েছে; বাংলার করোনা পজিটিভ রেট বেড়ে গেছে। বেড়েছে মৃত্যুর সংখ্যা। আতঙ্কে চিকিৎসক মহল ও বাংলার স্বাস্থ্য দফতর।

সামনেই দু দুটো ভোট; তাই প্রতিদিন মিছিল মিটিং। আসলে গদির লড়াই। একটা পুরভোট আর একটা বিধানসভা ভোট। তাই করোনা মহামারীর মধ্যেও; মানুষের জীবনকে ‘দাঁও এর মুখে দাঁড়’ করাতে; একবারও ভাবেন না রাজনৈতিক নেতা নেত্রীরা। শাসক বিরোধী সবাই আইন ভাঙছেন; পুলিশের সামনেই। আজ পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে; কোন অভিযোগ নেই। বিরোধী দলের বিরুদ্ধে যাও বা নেওয়া হয়েছে; শাসক দলের নেতা-নেত্রীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস; রাজ্য পুলিশের নেই। তবে, সাধারণ মানুষ আইন ভাঙলে; করোনা আবহে পুলিশ কি করতে পারে; তার ন্মুনা দেখেছে রাজ্যের মানুষ।

আরও পড়ুনঃ করোনা মহামারীর মধ্যেও বিধিনিষেধ ভেঙে মিছিল তৃণমূল-বিজেপির, কোভিড পজিটিভ দিলীপ ঘোষ

আর কি করেই ব্যবস্থা নেবেন? রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী যদি নিয়ম ভাঙেন; তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে কি করে ব্যবস্থা নেয় পুলিশ! উত্তরপ্রদেশের হাথরস কাণ্ডের প্রতিবাদে; নিজের রাজ্য সরকারের আরোপ করা সব বিধিনিষেধ উড়িয়ে; মিছিল করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই। সেই মিছিলেও কয়েক হাজার মানুষ; অংশগ্রহণ করেন। এই মিছিলকে, করোনার ‘সুপার স্প্রেডার’; ইভেন্ট বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে মানুষের কথা ভাবার এখন সময় নেই; রাজ্যের শাসক দলের। ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে ভোট আর বিজেপি। ফলে, শ-খানেক মানুষ মরুক; তাতে কিস্যু যায় আসে না।

একদিকে, চিকিৎসকরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন; “দুর্গাপুজোর আনন্দ করতে গিয়ে; সংক্রমণকে বাড়িতে ডেকে আনলে কে বাঁচাবে?” অন্যদিকে, এর মধ্যেও একের পর এক; পুজোর উদ্বোধনে মুখ্যমন্ত্রী। আর মুখ্যমন্ত্রীর দুর্গা পুজো নিয়ে বাড়াবাড়িতে মদত দিচ্ছেন; তাঁবেদার কলকাতার পুজো উদ্যোক্তারা। নেত্রীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে; মহামারী বাড়াচ্ছেন পুজো উদ্যোক্তারা। মহারাষ্ট্রে গণেশ পুজো বন্ধ হতে পারে; বাংলায় ইদ-মহরম বন্ধ থাকতে পারে। কিন্তু দুর্গাপুজো উৎসব বন্ধ রাখা যাবে না। নেত্রীর ভোট বড় বালাই; আর পুজো উদ্যোক্তাদের দেখনদারির লড়াই।

আরও পড়ুনঃ বাংলার বাড়ছে করোনা পজিটিভ রেট, ঘুম উড়েছে স্বাস্থ্য কর্তাদের, পুজো উদ্বোধনে মুখ্যমন্ত্রী

মমতার সমালোচনা করেছেন; বিরোধীরা। কংগ্রেস নেতা আব্দুল মান্নান; সিপিএম বিধায়ক সুজন চক্রবর্তী; ও বিজেপি সাংসদ ও রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ; এই নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমালোচনা করেছেন। তবে, মুখ্যমন্ত্রী পরিষ্কার বলেছেন; “দুর্গাপুজো বাঙালির বড় উৎসব; দুর্গাপুজোয় কি মানুষ আনন্দ করবে না”। তবে, যারা সমালোচনা করছেন; তারাও কম যান না। সিপিএম কংগ্রেস; হাজার লোক নিয়ে মিছিল করেছে।

কেন্দ্রের জারি করা সব নিয়ম ভেঙে; রাজ্যে নবান্ন অভিযান করল কেন্দ্রেরই শাসক দল বিজেপি। সবচেয়ে বেশি করোনা করোনা ছড়াচ্ছে; কলকাতা ও উত্তর ২৪ পরগনায়। আর এই দু জায়গাতেই; হাজার হাজার মানুষ জড়ো করে মিছিল মিটিং করছে; গেরুয়া শিবির। লক্ষ্য পুরভোট; তার চেয়েও বেশি বিধানসভা ভোট; আর ‘পাখির চোখ’ বাংলার গদি। তার জন্য সাধারণ মানুষের পরিবার থেকে তো; দু চারজনকে বলি দিতেই হবে। ইতিমধ্যেই, বিজেপির নবান্ন অভিযান; রাজ্যে করোনার ‘সুপার স্প্রেডার’ ইভেন্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু নেতা দিলীপ ঘোষ ভর্তি আমরি হাসপাতালে; আর সমর্থকরা সরকারি হাসপাতালে একটা বেড না পেয়ে মরছেন।

আরও পড়ুনঃ পুজো অনুদান নিয়ে কড়া হাইকোর্ট, দিতে হবে পাই পয়সার হিসাব, কিসে খরচা করতে হবে তাও বলে দিল আদালত

এদিকে আরও হাস্যকর ব্যাপার ঘটেছে। পুজোর পর নাকি আসতে পারে করোনার ‘সুনামি’; তাই টানা ছমাস কড়া পদক্ষেপের ভাবনা রাজ্য় সরকারের। “কড়া পদক্ষেপের ভাবনা নেওয়া হচ্ছে”; এমনটাই বলছে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর। আরও আশঙ্কা, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে করোনার বিপদ; লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে। স্বাস্থ্য দফতরের রিপোর্টে; উঠে এসেছে মারাত্মক তথ্য। আর এই রিপোর্ট দেখেই; মাথায় হাত সরকারি আমলাদের। পুজোর মরসুমে মানুষ সতর্ক না থাকলে; করোনা মহামারী ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলেই; স্বাস্থ্য দফতরের আশঙ্কা। একদিকে, বাংলার বাড়ছে করোনা পজিটিভ রেট; ঘুম উড়েছে স্বাস্থ্য কর্তাদের; অন্যদিকে একের পর এক পুজো উদ্বোধনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা স্বয়ং।

স্বাস্থ্য দফতরের রিপোর্টে প্রকাশ, মার্চ থেকে আগস্ট মাসে; রাজ্যে করোনা ভাইরাস; বেশ কিছুটা নিয়ন্ত্রণেই ছিল। কোভিড হাসপাতালের; বেড খালি ছিল। বাস্তব চিত্র যাচাই করতে, গোটা সেপ্টেম্বর জুড়ে কলকাতা, দার্জিলিং সহ; পাঁচটি জেলার সাত হাজার মানুষের; লালারস বা নাসিকা নিঃসৃত রস পরীক্ষা হয়। পরীক্ষা হয় স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনে। আবার নাইসেডও নিজের মতো করে; সমীক্ষা চালায়। আর সেই রিপোর্টে দেখে; ঘুম ছুটেছে রাজ্য স্বাস্থ্য কর্তাদের।

আরও পড়ুনঃ স্কুল কলেজ বন্ধ, লোকাল ট্রেনে অনুমতি নয়, দুর্গা পুজোতে রাস্তায় নেমে উৎসব পালনে উৎসাহ কেন

রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের প্রধান সচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম জানিয়েছেন; “মাত্র একমাসের ব্যবধানে; পজিটিভ রেট ২.২ শতাংশ বেড়েছে। আগস্টে ছিল ৬.৯০ শতাংশ; এখন ৮.৪৮ শতাংশ”। স্বাস্থ্যসচিবের কথায়; “করোনা সংক্রমণ রুখতে, পুজোর উৎসব থেকেই অর্থাৎ অক্টোবর মাস থেকে; ২০২১ এর মার্চ পর্যন্ত; টানা ছয় মাস বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে”।

রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের রিপোর্টে চোখ বুলিয়ে; স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনের অধিকর্তা, ডা. প্রতীপকুমার কুণ্ডু আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন; “এমন অবস্থা হলে পুজোর সময় পজিটিভ হার; দশ শতাংশে পৌঁছে যাবে। অসুস্থতার সংখ্যা আরও বাড়বে। আমাদের আরও সচেতন হতে হবে”। স্বাস্থ্য দপ্তর উত্তরের দার্জিলিং, পশ্চিম ও পূর্ব মেদিনীপুর, হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা; এবং কলকাতার বিভিন্ন অংশের বাসিন্দাদের থেকে; যে চিত্র পেয়েছে তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক বলেই মনে করেন; রাজ্যের স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম।

আশঙ্কায় কাঁপছে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর। আর বিরাট জনসমুদ্র নিয়ে মিছিল করার পর; নাচতে নাচতে পুজো উদ্বোধন করছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ওদিকে করোনা আশঙ্কায় বন্ধ স্কুল কলেজ, লোকাল ট্রেন। রুজি রোজকার বন্ধ; বাংলার কয়েক কোটি মানুষের। আর বিরোধী দলও ব্যস্ত; সরকারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে, সেই সাধারণ মানুষকেই বিপদে ফেলতে। আর এই নেতা নেত্রীদের তাঁবেদার ও অন্ধভক্তদের ভয়ে; মুখ খুলতে নারাজ বাংলার বাসিন্দারা। সোশ্যাল মিডিয়ায় খাপ পঞ্চায়েত বসিয়ে প্রমাণ করে দেবে; আপনি দুর্গা পুজোর বিরোধী। ফলে, ‘যা হচ্ছে ঠিকই হচ্ছে; যা হবে ঠিকই হবে’; গীতার বানী অনুসরণ করে; ‘অল ইস ওয়েল’ বলে দুহাত তুলে নেত্য করছে আমজনতা।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন