বেমালুম উধাও হয়ে যান, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে ইঞ্জেকশন দেওয়া নার্স রাজদুলারী টিকু

2849
বেমালুম উধাও হয়ে যান শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে ইঞ্জেকশন দেওয়া নার্স রাজদুলারী টিকু
বেমালুম উধাও হয়ে যান শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে ইঞ্জেকশন দেওয়া নার্স রাজদুলারী টিকু

বেমালুম উধাও হয়ে যান শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে; শেষবার ইঞ্জেকশন দেওয়া নার্স রাজদুলারী টিকু! তাঁর আর কোনদিন; কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি! যে রহস্যর সমাধান আজও হয়নি! শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, হিন্দু মহাসভার অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা; এবং জনসংঘ দলের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর রহস্যজনক মৃত্যু আজও ভারতবাসীর মনে; অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। জওহরলাল নেহেরুর আমলে শ্যামাপ্রসাদের; মৃত্যুর কারণ আজও ভারতবাসীর কাছে রহস্য। কাশ্মীরে জওহরলাল নেহেরু ও শেখ আবদুল্লার পুলিশ কাস্টডিতে; অদ্ভুতভাবে মৃত্যু হয় শ্যামাপ্রসাদের। আর অনেকটাই নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর মত; উধাও হয়ে গিয়েছিলেন, শ্যামাপ্রসাদকে ইঞ্জেকশন দেওয়া নার্স রাজদুলারী টিকু।

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়; তাঁর মৃত্যু রহস্যাবৃত। ১৯৫৩ সালের ১১ মে কাশ্মীরে ঢোকার মুহূর্তে; তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। শ্রীনগরের সেন্ট্রাল জেল থেকে; তাঁকে পাঠানো হয় একটি আলাদা কটেজে। বন্দিদশায় দ্রুত অবনতি হয় শরীরের। ডাক্তার বলেন, উনি ড্রাই প্লুরিসিতে আক্রান্ত। সরকারি নথি অনুযায়ী তাঁর মৃত্যু হয়; ২৩ জুন রাত ২টো ২৫ মিনিটে। মৃত ঘোষণা করা হয়; রাত ৩টে ৪০ মিনিটে। মৃত্যুর অফিসিয়াল কারণ; হার্ট অ্যাটাক। শেষ সময়ে পাশে ছিলেন; রাজদুলারি টিকু বলে এক নার্স।

তাঁর বয়ান অনুযায়ী, যন্ত্রণায় কাতর শ্যামাপ্রসাদকে; ইঞ্জেকশন রেডি করে দিয়েছিলেন চিকিত্‍সক। সেই ইঞ্জেকশন শ্যামাপ্রসাদের শরীরে পুশ করেছিলেন; নার্স রাজদুলারী টিকু। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির মৃত্যু হয়েছিল; কাশ্মীরে প্রায় লোকচক্ষুর অন্তরালে। সরকারি তথ্যে আজও লেখা আছে; মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ বা হার্ট অ্যাটাক। আচমকাই কাশ্মীরের শ্রীনগর শহরের ভাড়াবাড়ি ছেড়ে; নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন সেই নার্স রাজদুলারি টিকু। যিনি ডাক্তারের নির্দেশমতো ইনজেকশনটি দেওয়ার পরই; “জ্বলে গেল, পুড়ে গেল, আমি জ্বলে যাচ্ছি”; বলে চিৎকার করে ওঠেন শ্যামাপ্রসাদ এবং তারপরই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

আরও পড়ুনঃ আরব হানাদার-দের দমন করেও, ভারতের ‘ধর্মনিরপেক্ষ ইতিহাসে’ জায়গা পাননি, রাজা বাপ্পাদিত্য রাওয়াল

শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যুর পর কাশ্মীরে গিয়ে; রাজদুলারির সঙ্গে দেখা করেছিলেন; শ্যামাপ্রসাদের কন্যা সবিতা এবং তাঁর স্বামী নিশীথ। পরিচয় গোপন করেই তারা দেখে এসেছিলেন; পাহাড়ি জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত সেই কুটির; যেখানে বন্দি করে রাখা হয়েছিল শ্যামাপ্রসাদ আর তার দুই সঙ্গীকে। তারপর অনেক অনুসন্ধান করে; পৌঁছেছিলেন রাজদুলারীর কাছে। রাজদুলারী সব সত্য ফাঁস করে দিয়ে; ডুকরে কেঁদে উঠেছিলেন। বলেছিলেন; “আমি পাপ করেছি। মহাপাপ”।

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং তার দুই সঙ্গী যুবক, দিল্লি জনসংঘ শাখার সভাপতি; আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞ এবং লেখক গুরুদত্ত বেদ ও দেরাদুনের দলীয় কর্মী টেকাদকে কাশ্মীর পুলিশ গ্রেফতার করেছিল; মাধোপুর চেকপোস্ট থেকে। শ্যামাপ্রসাদের অপরাধ ছিল; প্রধানমন্ত্রী নেহরু এবং অনৈতিকভাবে নির্বাচিত কাশ্মীরের প্রধান শাসক শেখ আবদুল্লার; প্রবর্তিত অনুমতিপত্র ছাড়াই তিনি কাশ্মীরে প্রবেশ করেছিলেন।

যদিও একথা পরে প্রমাণ হয়েছিল যে; ভারত সরকার বিনা অনুমতিতে কাশ্মীর প্রবেশের জন্য গ্রেফতার করেনি। আসলে প্রধানমন্ত্রী নেহরু ভয় পেয়েছিলেন। যদি মুক্ত পুরুষ হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী; কাশ্মীরে ঢুকে জনসাধারণের কাছে প্রকৃত সত্যটা তুলে। তাহলে চরম বিপদ। বিশেষ করে জনরো’ষের কবলে পড়বেন তিনি। অতএব তাঁরই নির্দেশে, কাশ্মীর সরকার শ্যামাপ্রসাদকে গ্রেফতার করল জন নিরাপত্তা আইনে!

আরও পড়ুনঃ বাঙালি বিজ্ঞানী, ইংরেজ আমলে পাননি নোবেল, স্বাধীন ভারতে সম্মান জোটেনি বাংলায়

শ্যামাপ্রসাদের অপরাধ ছিল, তিনি কাশ্মীরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে জানতে চেয়েছিলেন; কাশ্মীরবাসীরা কী চান? কাশ্মীরবাসীরা কেমন আছেন? প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে নিয়েই; শুরু করবেন জন আন্দোলন। কিন্তু এক আকাশে দুটি সূর্য? নেহরু তা মেনে নেবেন কী করে? অগত্যা শ্যামাপ্রসাদ ও তার দুই সঙ্গীকে, একরাতের জন্য শ্রীনগর সেন্ট্রাল জেলে রাখলেও; পরদিনই তাদের নিয়ে যাওয়া হল এক অজানা জায়গায়। ডাল লেক তীরবর্তী; পাহাড়ের খাড়াই চূড়ায় এক ছোট্ট কুটিরে। চারপাশে কোনো বসতি নেই। কোনও চিকিৎসালয় নেই।

২৩ জুন সকালেও ব্যারিস্টার ত্রিবেদী; মোটামুটি সুস্থই দেখে গেলেন শ্যামাপ্রসাদকে। দু-একদিনের মধ্যেই হাসপাতাল থেকে, ছাড়া পেয়ে যাবেন শ্যামাপ্রসাদ; এমনটাই বলা হল। ঐদিনই ভোর পৌনে চারটের সময় ব্যারিস্টার ত্রিবেদীকে, খবর দেওয়া হল; শ্যামাপ্রসাদের অবস্থা ভালো নয়। গুরু দত্ত বেদ, টেকচাঁদ, পন্ডিত প্রেমনাথ ডোগরা প্রমুখকে সঙ্গে নিয়ে; ব্যারিস্টার ত্রিবেদী যখন হাসপাতালে পৌঁছলেন; ততক্ষণে সব শেষ। হাসপাতালের বক্তব্য ৩.৪০ মিনিটেই; মারা গেছেন শ্যামাপ্রসাদ। কিন্তু কীভাবে? কেন?

আর আসল সত্যটা বেরোল; অনেক পরে। সবচেয়ে বড় সত্যটা জানিয়েছিলেন; রাজদুলারী টিকু। সেই নার্স যিনি মাতৃসদনে; একজন পুরুষ রোগীকে দেখে অবাকই হয়েছিলেন। এবার শোনা যাক, রাজদুলারীর মুখেই; ভারতের মহান সন্তানের শেষক্ষণটুকুর কাহিনি। “উনি ঘুমোচ্ছিলেন, ইনজেকশনটা রেডি করে; চলে গিয়েছিলেন ডাক্তার। নির্দেশ ছিল, ঘুম ভাঙলেই যেন; ইনজেকশনটা দেওয়া হয়”।

আরও পড়ুনঃ বিশ্বে প্রথম মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন এক বাঙালি নারী

“শ্যামাপ্রসাদের ঘুম ভাঙতেই; ইনজেকশনটা দিলাম। আর তারপরেই বিছানায় গড়াগড়ি খেতে; শুরু করলেন উনি। চীৎকার করছেন; জ্বলে গেল, পুড়ে গেল। জ্বল যাতা হ্যায়। জ্বল রহা হ্যায়”। “আমি ডাক্তারকে ফোন করলাম। উনি বললেন, ঠিক হ্যায়; সব ঠিক হো যায়গা। তারপর আস্তে আস্তে; স্থির হয়ে গেল ওঁর শরীরটা”।

শ্যামাপ্রসাদের মেয়ে সবিতার চোখের জল; তাকে সত্য বলতে বাধ্য করে। তারপরই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান; আর তাঁর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। কারণ পরদিন সেই বাড়িতে গিয়ে; সবিতাদেবী আর রাজদুলারীকে আর দেখতে পাননি। আজও তিনি নিখোঁজ; কেউ জানে না তিনি কোথায়। তাঁর সঙ্গেই উধাও, শ্যামাপ্রসাদের গুরুত্বপূর্ণ ডায়েরি; প্রেসক্রিপশন এবং সেই ইনজেকশনের অ্যাম্পুলটিও। শুধু সরকারি সত্য হিসেবে বেঁচে আছে; হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবনাবসান।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন