বন্দুক ছেড়ে হাতে গিটার তুললেন ‘বিপ্লবী’, প্রেসিডেন্সির ছাত্র সৃষ্টি করলেন ইতিহাস

2002
বন্দুক ছেড়ে হাতে গিটার তুললেন 'বিপ্লবী', প্রেসিডেন্সির ছাত্র সৃষ্টি করলেন ইতিহাস
বন্দুক ছেড়ে হাতে গিটার তুললেন 'বিপ্লবী', প্রেসিডেন্সির ছাত্র সৃষ্টি করলেন ইতিহাস

বন্দুক ছেড়ে হাতে গিটার তুললেন ‘বিপ্লবী’; প্রেসিডেন্সির ছাত্র সৃষ্টি করলেন ইতিহাস। একলাইনে এটাই তাঁর জীবনের গল্প; তবে লিখতে শুরু করলে তা একটা বইয়েও ধরবে না। যে হাতের বন্দুক থেকে একসময়ে সঠিক টার্গেটে ছুটে গিয়েছিল বুলেট; সেই হাতেই পরবর্তীকালে বেজেছে গিটার; সৃষ্টি হয়েছে কালজয়ী গান। তৈরি হয়েছে, বাংলার প্রথম ব্যান্ড। প্রেসিডেন্সি প্রাক্তনি, নকশাল বিপ্লবী, গান ভোলা এক মরমী সাধক; একদিকে বাঙালি সংগীতজ্ঞ, গায়ক, গীতিকার, থিয়েটার ব্যক্তিত্ব, চলচ্চিত্র নির্মাতা, নৃতাত্তিক, আবার ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ ফোক-রক ব্যন্ডের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি গৌতম চট্টোপাধ্যায়।

“পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে; স্যাটেলাইট আর কেবলের হাতে; ড্রয়িংরুমে রাখা বোকা বাক্সতে বন্দী, আ হা হা হা আ হা… “; সহজ সরল সত্যটা একদিন কাঁপিয়ে দিয়েছিল; বাঙালির ড্রইংরুম থেকে পুজো প্যান্ড্যাল। পিছনের ইতিহাসটা এতটাও; সহজ সরল ছিল না। ১৯৬০-এর দশকে প্রেসিডেন্সি কলেজে মনোবিজ্ঞান বিষয়ে; পড়ার সময়ে তাঁর অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বন্ধুদের নিয়ে; ‘দ্য আর্জ’ নামে একটি ব্যন্ড গঠন করে ছিলেন গৌতম।

আরও পড়ুনঃ জওহরলাল নেহেরুর গলায় মালা দিয়ে, ৬০ বছর পরেও একঘরে ‘নেহেরুর বউ’

১৯৬৯-৭০ সালের দিকে, নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে; গৌতম মনেপ্রাণে জড়িত হয়ে পড়েন। অ’স্ত্র, অজ্ঞাতবাস, গোপন ডেরায় বক্তৃতা; শুরু করেন নেতৃত্ব দিতে। গাইতেন গানও। ফলে গ্রেফতার ও বহুবার নির্যাতনের শিকার হন। এরপর তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায়; পুলিশ লক-আপে পাওয়া যায়। যদিও এতো নির্যাতনের পরও; তিনি কোনদিন নকশাল আন্দলনের কোন তথ্য প্রকাশ করেননি; এমনই গোপনীয়তায় শিরদাঁড়া সোজা রেখে করেছেন বিপ্লব।

বাবা পেশায় বিজ্ঞানী হলেও; বরাবরই ছিলেন সংগীত রসিক; অল্পবিস্তর করতেন চর্চাও। সেই সুবাদে বেহালার বাড়িতে; চিরকালই গান বাজনার চর্চা ছিল। সেই আমলে অনেক শিল্পীও আসতেন বাড়িতে; বাজাতেন বাদ্য, গাইতেন গান। যার বেশির ভাগটাই ছিল শাস্ত্রীয় সংগীত। বাড়িতে ছিল নানাবিধ যন্ত্র। সেতার; অর্গান; এস্রাজ; হারমোনিয়াম; ব্যাঞ্জো; ভায়োলিন; তবলা। আরও কত কি!

গৌতমরা ছিলেন পাঁচ ভাই। ছোটবেলা থেকে তাঁরাও; বিভিন্ন যন্ত্রের তালিম নিতেন নিয়মিত। গৌতম বাজাতেন তবলা। তবে তাঁর ভাই এবং মহীনের ঘোড়ার অন্যতম ঘোড়া; প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতি বলে ওঠে; “মণিদা (গৌতম) সবই বাজাতে পারত। যে কোনও ইনস্ট্রুমেন্টই; খুব সহজে বাজিয়ে ফেলত। তালিম ছাড়াই। নিজে নিজেই শিখে ফেলত; বাজানোর আদব-কায়দা”। তবে তবলায় বিশেষ ভাবে হাত পাকিয়ে ছিলেন গৌতম।

আরও পড়ুনঃ ভাসছে লাশ, এই গঙ্গা বাঁচাতেই ভারতবাসীর অজান্তে ১১১ দিনের অনশনে জীবনদান

নকশাল আন্দোলনের উত্তাল ঢেউয়ে; ভেসে গেলেন গৌতম। আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকার সময়; একদিন কলকাতায় বাড়িতে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। সেদিনই পুলিশের হাতে ধরা পড়ে গেলেন। প্রায় দেড় বছর পর; জেল থেকে বাইরে এলেন। হাতে গিটার তুলে নিলেন গৌতম। তারপরে শুরু হল; আর এক বিপ্লব। প্রেসিডেন্সি কলেজের নকশাল ছাত্র; একদিন সৃষ্টি করল বাংলা ব্যান্ডের গান। শুধু তাই নয়, অনেকের মতে; গৌতম চট্টোপাধ্যায়ই হলেন ভারতবর্ষে রক ব্যান্ডের জন্মদাতা। ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’; কেবল একটি গানের দল ছিল না; ছিল একটি রক্তাক্ত হওয়ার বিপ্লব।

সত্তর দশকের শুরুর দিক। গিটার, ড্রামসের সঙ্গে তেমনভাবে; কেউ পরিচিত হননি কলকাতায়। সে সময় গান মানে হেমন্ত মান্না সন্ধ্যা লতা; বাংলার সংস্কৃতির আকাশে দখলদারি ছিল রবীন্দ্র-নজরুল নাইট। এমনই এক সাংস্কৃতিক আবহে; প্রতি রাতে ড্রামস-গিটারের দাপাদাপি শুরু হয়েছিল গোপনে; নাকতলা অঞ্চলের এক পুরনো বাড়িতে। বিরক্ত হতো সবাই। ‘ভদ্দরলোকের’ সময় নয় মধ্যরাত। একদিন নয়, দিনের পর দিন চলত; এই পাগলামি। ‘বাধ্য’ হয়েই প্রতিবেশীরা সেই বাড়ির পাঁচিলে; গোপনে লিখে দিয়েছিলেন ‘আস্তাবল’। সেই আস্তাবল থেকেই একদিন; বাংলা কাঁপাতে বেরোল কয়েকটি ঘোড়া; ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’।

গল্পটা এখানেও এত সোজা ছিল না। দীর্ঘ দেড় বছর জেলে থাকার পর; গৌতম অবশেষে মুক্তি পেয়েছিলেন একটাই শর্তে; পশ্চিমবঙ্গের বাইরে থাকতে হবে তাঁকে। আশ্চর্যের বিষয় হল, জেলজীবনে অসংখ্য গান লিখলেও; একটিও রাজনৈতিক গান লেখেননি গৌতম। সবই কেমন রোমান্টিক গান। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর গৌতমের; মূলস্রোতের রাজনীতি থেকে খানিকটা নিরাপদ দূরত্ব তৈরি হয়। শেষে কাঁধে স্প্যানিশ ঝুলিয়ে; চলে গেলেন ভোপাল। শুরু করলেন; মেডিকেল রিপ্রেজ়েন্টেটিভের কাজ। সেই সময়ই গৌতম, চুটিয়ে গান লিখছেন; গাইছেনও সুর করে বহু গান। মহীনের প্রস্তুতি পর্ব; তখনই শুরু হয়ে গিয়েছিল, সেই প্রবাসে বসেই।

আরও পড়ুনঃ ৪ বছরে ২১ বার ফ্রি বিমানযাত্রা, একমাত্র ‘ভারতরত্ন’ হিসেবে নজির গড়লেন অমর্ত্য সেন

মহীনের ঘোড়াগুলি ১৯৭৬ সালে; কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম বাংলা রক ব্যান্ড। এটি ভারতের প্রথম রক ব্যান্ড। ১৯৭৭ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত; সংবিগ্ন পাখিকূল ও কলকাতা বিষয়ক (১৯৭৭), অজানা উড়ন্ত বস্তু বা অ-উ-ব (১৯৭৮) এবং দৃশ্যমান মহীনের ঘোড়াগুলি (১৯৭৯); এই তিনটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। তবে সে সময়ে তারা; প্রায় অপরিচিত ছিল বলা যায়। তবে সেই আমলেও ঘোড়ার দল সাড়া ফেলে দিয়েছিল; রবীন্দ্রসদনে মস্ত একটা শো করে। সেই শুরু ইতিহাসের!

আশির দশকের শুরুতেই, ব্যান্ডটি ভেঙে যাবার পর; সদস্যরা বিভিন্ন কর্মজীবনে চলে গেলে; ভেঙে পরেন গৌতম। গানপাগল গৌতম চট্টোপাধ্যায়ও; কলকাতায় চলচ্চিত্র নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। অপরদিকে বিশ্বনাথ চট্টোপাধ্যায়; পাড়ি জমান সান ফ্রান্সিসকোতে। প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় তার প্রকৌশলী জীবনে; মনোযোগ দেন। রঞ্জন ঘোষাল বেঙ্গালুরুতে বিজ্ঞপণ আর থিয়েটারে; যুক্ত হয়ে পড়েন। আব্রাহাম মজুমদার জার্মানিতে; মিউজিক স্কুল চালু করেন। তাপস দাস কলকাতায় চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে; কাজ শুরু করেন। আর তপেশ বন্দ্যোপাধ্যায় যোগ দেন; তার নিজের কর্মজীবনে।

গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের পথ বেয়েই; একদিন বাংলার বুকে জন্ম নিল কত জনপ্রিয় ব্যান্ড; ভূমি, চন্দ্রবিন্দু, ক্যাকট্যাস, দোহার, শহর, পরশ পাথর, কালপুরুষ, ফসিলস আরও কত। এইভাবেই কাঁধে বন্দুক হাতে গিটার নিয়ে; এক স্বপ্নসন্ধানী বাঙালির যুবকের হাত ধরেই; তৈরি হল ইতিহাস। বাংলা গানে বিপ্লবের পিছনেও; সেই গানপাগল বিপ্লবী।

আরও পড়ুনঃ বিশ্বের বৃহত্তম হিমবাহে ভাঙন, ভবিষ্যতে বিপদের মুখে দক্ষিণবঙ্গ, কলকাতা ও বাংলাদেশ

নকশাল আন্দোলনের সময় আন্ডারগ্রাউণ্ডে থাকা অবস্থায়; ১৯৭০ সালে মিনতি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপ। এক বিপ্লব শান্ত হলে, বাংলায় ফিরে মিনতি-কেই বিয়ে করেন; গানপাগল গৌতম। এ-ও যেন এক বিপ্লব! চির বাউন্ডুলে গৌতম; বিয়ের এক বছর পর বাবা হলেন। ছেলের নাম রাখলেন গাবু। বাংলা ব্যান্ডের বর্তমান চিত্রে; সেই গাবু একটা পরিচিত নাম। গাবুর জন্মের প্রায় সাত বছর পরে; জন্ম হয় গৌতমের মেয়ে চিকিতার। গাবুর ভাল নাম যেমন; প্রায় কেউ জানেন না। চিকিতাও তেমন বাবার দেওয়া ডাকনামেই পরিচিত; গানপাগল বাঙালির কাছে।

ইতিহাস এখানেই শেষ নয়। আরেকটা বিশাল চমক! গানের মাঝেই হঠাৎ করে গৌতমের; চলচ্চিত্র সৃষ্টি করার কথা মনে আসে। পরিচালনা করলেন ‘নাগমতী’। প্রথম ছবিই জাতীয় পুরস্কার লাভ করল। একেই কি বলে বিস্ময়কর প্রতিভা! আর কে না জানে; প্রতিভাধররা ক্ষণজন্মা হন। মাত্র একান্ন বছরে চলে গেলেন গৌতম চট্টোপাধ্যায় (১৯৪৮-১৯৯৯)। কিন্তু যে স্বীকৃতি তাঁর পাওয়ার কথা ছিল; বাংলা সেই স্বীকৃতি দিয়েছে কি? বাংলা তাঁকে আটকে রাখল ব্যান্ডেই!

শেষ হয়েও হয় না শেষ। বহু বছর পরে গৌতমের গান আবার ফিরে এল; বলিউডের গ্যাংস্টার ফিল্মে। নতুন প্রজন্ম নতুন করে জানল বিপ্লবী গৌতম চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর ঘোড়ার দলকে।
“ভিগি ভিগি সি হ্যায় রাতে…
ভিগি ভিগি ইয়াদে…
না জানে কোই ক্যাইসি হ্যায় ইয়ে জিন্দেগানি,
হামারি অধুরি কাহানি”…………

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন