৮০ টাকা ধার নিয়ে শুরু সাত গৃহবধূর কাজ, ৮০০ কোটি টাকার ব্যবসা আজ

1416
৮০ টাকা ধারে শুরু সাত ঘরের বউয়ের কাজ, ৮০০ কোটি টাকার ব্যবসা আজ
৮০ টাকা ধারে শুরু সাত ঘরের বউয়ের কাজ, ৮০০ কোটি টাকার ব্যবসা আজ

৮০ টাকা ধার নিয়ে শুরু সাত গৃহবধূর কাজ; ৮০০ কোটি টাকার ব্যবসা আজ! পরিবারের পেট ভরাতে, মাত্র ৮০ টাকা ধার নিয়ে শুরু হয় ব্যবসা; সেই ‘লিজ্জত পাঁপড়’ আজ বহু মহিলার ‘ইজ্জত’! ১৯৫৯ সালের ১৫ই মার্চ, দক্ষিণ বম্বের গিরগাঁও এলাকার এক বাড়ির ছাদে; সাত জন গুজরাতি গৃহবধূর হাত ধরে; একটি সমবায়ের পথ চলা শুরু হয়েছিল। ৮০ টাকা ধারের সেই ব্যবসা এখন; ৮০০ কোটি টাকার ব্যবসায় পরিণত। ৭ জন থেকে গোটা দেশে এখন কর্মী সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। ৭ ঘরের বউয়ের বিপ্লব; এখন ইতিহাসের পাতায়। ইচ্ছা ও পরিশ্রম করলে যে সব সম্ভব; তার প্রমাণ লিজ্জত পাঁপড়ের কাহিনী।

দক্ষিণ মুম্বাইয়ের একটি বাড়ির ছাদ থেকে, সাতজন গুজরাটি মহিলার; জাসবন্তীবেন জামনাদাস পোপাট; পার্বতীবেন রামদাস থোডানি; উজামবেন নারান্দাস কুন্ডালিয়া; বানুবেন এন তান্না; লাগুবেন অমৃতলাল গোকানি; জয়াবেন ভি বিথালানী ও চুতাড়বেন আমিশ গাওয়াড়ে হাত ধরে শুরু হয় একটি সমবায়। শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলেও, শুধুমাত্র রান্নার দক্ষতার উপরে নির্ভর করে; নিজেদের স্বনির্ভরশীল করতেই এই প্রচেষ্টা ছিল তাদের।

আরও পড়ুনঃ ভারতের ‘জেমস বন্ড’ ৭৬ বছরের অজিত ডোভালকে কেন ছাড়তে চায় না মোদী সরকার

যে প্রচেষ্টা মাত্র ৮০ টাকা থেকে শুরু হয়ে; বর্তমানে প্রায় হাজার কোটি টাকার ব্যবসায় পরিণত। আর ৪০০০০ এর বেশি মহিলাকে, নিয়ে গঠিত সমবায়; যাদের প্রত্যেকে আজ স্বনির্ভরশীল। আর সকলের কাছে; ‘লিজ্জত সিস্টার’ নামেই পরিচিত। যারা প্রত্যেকেই এই সমবায়ের মাধ্যমে; পাঁপড় প্রস্তুতিকরণ প্রশিক্ষণে শিক্ষিত। এই পাঁপড় প্রস্তুতকারী সমবায়, তাদের সুস্বাদু পাঁপড়; আজ শুধু ভারতবর্ষের ১৭ টা রাজ্যেই পৌঁছে থেমে থাকেনি। তারা ভারতবর্ষের পাশাপাশি; আরও ২৫টি দেশে তাদের পাঁপড় পৌঁছে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।

এই সমবায়ের পাঁপড় প্রস্তুতির, আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল; এই সমবায়ের পাঁপড় প্রস্তুতিকরণে, কোনো যন্ত্র ব্যবহার হয় না। সব পাঁপড় সম্পূর্ণ ‘লিজ্জত সিস্টার’-দের; হাতেই তৈরি। এছাড়াও এই পাঁপড় প্রস্তুতিকরণ হয়; একটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে। প্রত্যেকদিন নির্দিষ্ট সময়ে, সমবায়ের গাড়িতে চেপে; লিজ্জত সিস্টাররা পৌঁছায় তাদের নিকটবর্তী সমবায়ের শাখায়। যেখানে তাদের যেতে হয়; মোট তিনটি কাউন্টারে।

আরও পড়ুনঃ নিষিদ্ধ দ্বীপের বাঙালি রানী, অসম্ভবকে সম্ভব করা বাঙালি নারী

প্রথম কাউন্টারে তারা জমা করে, বাড়িতে তৈরি; তাদের আগের দিনের পাঁপড়। এবং সংগ্রহ করে; একটি টোকেন। যা নিয়ে তারা পৌঁছে যায়, দ্বিতীয় কাউন্টারে; তাদের পারিশ্রমিক সংগ্রহ করতে। সব শেষে তারা যায় তৃতীয় কাউন্টারে; পাঁপড় বেলার আটা মাখা সংগ্রহ করতে। যেটা ওই সমবায় আগে থেকেই; প্রস্তুত করে রাখে তাদের শাখাতেই। তাদের এমন করার কারণ; তাদের প্রত্যেকটা পাঁপড় এর স্বাদ একই রাখার জন্য। এরপর লিজ্জত সিস্টাররা; ফিরে যায় নিজেদের বাড়িতে। আর শুরু করে, পাঁপড় তৈরি করা; নিজেদের বাড়ির রান্না ঘরেই। আজও আফগানিস্তান থেকে; হিং আমদানি করা হয় কাঁচামাল হিসেবে। সেজন্যই কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত; লিজ্জত পাঁপড়ের স্বাদ একইরকম থাকে।

কিন্তু গল্পটা এত; সোজাও ছিল না। বাড়িতে মজুত উপকরণ দিয়ে, চার প্যাকেট পাঁপড় তৈরি করে; পুরুষোত্তম দামোদর দত্তানি নামক এক ব্যক্তির সাহায্যে; বাজারে বিক্রি করার জন্য অনেক দোকানে ঘোরার পর; আনন্দজি প্রেমজি কোম্পানি নামক এক দোকানে সেই পাঁপড় বিক্রি হয় এবং গুণগত মানের জন্য চাহিদা বাড়তে থাকে। সেই শুরু। তবে তখনকার বম্বে এতটাও উদার ছিল না যে; সাধারণ গৃহবধূকে ব্যবসাতে উৎসাহিত করবে।

আরও পড়ুনঃ বেমালুম উধাও হয়ে যান, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে ইঞ্জেকশন দেওয়া নার্স রাজদুলারী টিকু

কিন্তু, সমাজসেবী এবং সার্ভেন্ট অফ ইন্ডিয়ার কর্ণধার; ছগনলাল পারেখ তাঁদের অদম্য উদ্যমে অভিভূত হয়ে; ৮০ টাকা দিয়ে সাহায্য করেন। মাত্র ৮০ টাকা নিয়ে শুরু হল; সম্পূর্ণ মহিলা পরিচালিত কুটির শিল্প বিপ্লব। প্রথম দিন ১ কেজি পাঁপড় বেচে; আট আনা লাভ হয়েছিল। তারপর তো ইতিহাস। সেই ৮০ টাকা আজ; ৮০০ কোটিতে পৌঁছেছে। ৭ জন পরিণত হয়েছে ৫০ হাজার-এ। ১৭টি রাজ্যে রয়েছে; মোট ৮২টি শাখা।

১৯৬২ সালে এক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে; নামহীন সেই পাঁপড়ের জন্য ‘লিজ্জত’ নামটি বেছে নেওয়া হয়। গুজরাতিতে যার অর্থ; হল সুস্বাদু। নাম গুজরাতি হলেও, কোন ভাষা, ধর্ম, বর্ণের সঙ্কীর্ণতার মধ্যে; এই উদ্যোগ সীমাবদ্ধ ছিল না। কোনরকম টেকনিক্যাল, প্রফেশানাল স্কিল ছাড়া; শুধুমাত্র নৈমিত্তিক রান্নাঘরের জ্ঞান সম্বল করে; স্বামী পুত্র পরিবার সামলে সাত গৃহবধূ হয়ে উঠলেন ‘বিজনেস উইমেন’। ১৯৬৬ সালে সেই পাঁপড়ের কোম্পানির নাম; ‘শ্রী মহিলা গৃহ উদ্যোগ” নামে রেজিষ্ট্রেশান করা হল। বাস্তবিকই ‘লিজ্জত’; তাঁদের দিল ‘ইজ্জত’।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন