শনি শিগনাপুর গ্রামে দরজাবিহীন বাড়িঘর থাকার কিংবদন্তি কাহিনী

227
শনি শিগনাপুর গ্রামে দরজাবিহীন বাড়িঘর থাকার কিংবদন্তি কাহিনী/The News বাংলা
শনি শিগনাপুর গ্রামে দরজাবিহীন বাড়িঘর থাকার কিংবদন্তি কাহিনী/The News বাংলা

ঘর আছে; কিন্তু দরজা নেই। মানুষ আছে; কিন্তু চোর নেই। সম্পদ আছে; অথচ পাহারা নেই। কথাগুলো শুনতে অবাক লাগলেও; বাস্তবে মহারাষ্ট্রের শনি শিগনাপুর গ্রামের ছবি ঠিক এমনই। গ্রামের মানুষ তালা ব্যবহার করে না। তালা তো দূরে থাক; দরজাই নেই কোন বাড়ি-ঘরে। এমনকি দোকান-পাট তালা ছাড়া থাকলেও; এ গ্রামের অধিবাসীরা নিশ্চিন্তে থাকেন। চোরের কোনো ভয় নেই তাদের মনে। সম্পদ রক্ষায় তাদের একমাত্র ভরসা ভগবান।

আরও পড়ুনঃ কেন মা কালীর পায়ের নিচে বাবা মহাদেব

শনি শিগনাপুর গ্রামের বাড়িঘর; তালাহীন থাকার পেছনে একটি কিংবদন্তি চালু রয়েছে। তারা বলে থাকে; প্রায় ৩০০ বছর আগে প্রবল বৃষ্টির পর বন্যা হয়। বন্যায় পানাশনালা নদী থেকে; কালো পাথরের একটি বড় ফলক গ্রামের মধ্যে ভেসে আসে। স্থানীয় এক বাসিন্দা; ১.৫ মিটার লম্বা এ পাথরটিকে একটি লাঠি দিয়ে আঘাত করে। এবং সারা গ্রামবাসী অবাক হয়ে দেখে যে; এ আঘাতে পাথরটি থেকে রক্ত বের হচ্ছে।

এরপরের রাতে; গ্রাম প্রধান স্বপ্নে ভগবান শনিকে দেখতে পান। স্বপ্নে ভগবান শনি জানান; এই পাথরটি আসলে তারই মূর্তি। ভগবান শনি গ্রামের প্রধানকে হুকুম দিলেন; এই পাথরটি গ্রামে সংরক্ষণ করতে হবে। শনি আরেকটি শর্ত জুড়ে দিলেন যে; এখন থেকে গ্রামের সবকিছু খুলে রাখতে হবে। তিনিই সবকিছু রক্ষা করবেন বলে প্রতিশ্রুতিও দিলেন।

আরও পড়ুনঃ জেনে নিন সিদ্ধপুরুষ ‘জয় বাবা লোকনাথ’ এর অজানা কাহিনী

গ্রামবাসীক পাথরটিকে; গ্রামের মধ্যবর্তী একটি খোলা জায়গায় স্থাপন করেন। এরপর তারা বাড়ির সব দরজা খুলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা মনে করে; ভগবান শনি থাকতে তাদের আর এগুলোর দরকার নেই।

৩০০ বছরের পুরনো সে রীতি আজও চলছে। গ্রামের লোকজন; কুকুর বা অন্যান্য পশু থেকে রক্ষা পেতে হালকা কাঠের ফ্রেম ব্যবহার করে। এমন অরক্ষিত অবস্থাতেই তারা টাকা-পয়সা; গহনা ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী রেখে বাইরে চলে যায়। তাদের বিশ্বাস; ভগবানই এসব সম্পদ রক্ষা করবেন। শুনতে অবাক লাগলেও তারা টয়লেটেও দরজা লাগায় না। লজ্জা নিবারণের জন্য পাতলা পর্দা ব্যবহার করে মাত্র।

গ্রামবাসী কোথাও গেলে; তাদের জিনিসপত্র দেখে রাখার জন্য পাশের বাড়িতে বলেও যায় না। তারা বিশ্বাস করে; কেউ যদি চুরি করে তাইলে সে অন্ধ হয়ে যাবে। আবার কেউ যদি; অসততার আশ্রয় নেয় তাইলে সে সাত বছর পরে হলেও বিপদগ্রস্থ হবে। গ্রামবাসী এটাও বিশ্বাস করে যে; কেউ যদি ঘরে কাঠের দরজা লাগায় তাইলে সে কিছুদিনের মধ্যেই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়।

আরও পড়ুনঃ নরকঙ্কালের খুলি সাজিয়ে জাগ্রত মহাশ্মশান কালীর পুজো

দিন দিন আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে গ্রামটিতে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ব্যাংক; পুলিশ ফাঁড়ি প্রভৃতি। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এ পুলিশ ফাঁড়ি গ্রামবাসীদের কাছ থেকে কোনোরকম অভিযোগ পায়নি। মজার ব্যাপার হল; গ্রামের রীতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে পুলিশ ফাঁড়িটিতেও কোনো মূল দরজা নেই।

সাধারণত ব্যাংকে কড়া নিরাপত্তা থাকে। কিন্তু সে ধারণাকে বদলে দিয়ে; এ গ্রামে ২০১১ সালে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক তাদের একমাত্র তালাবিহীন শাখা চালু করে। গ্রামবাসীর বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা রেখে; তারা রিমোট কন্ট্রোল কাঁচের দরজা বসিয়েছে।

আরও পড়ুনঃ অজানা কাহিনির আড়ালে সিদ্ধপিঠ তারাপীঠের তারা মা

শনি শিগনাপুর গ্রামের; এমন অদ্ভুত গল্প ছড়িয়ে গেছে সারা ভারতময়। প্রতিদিন কমপক্ষে ৪০,০০০ দর্শণার্থী আসে কালো পাথরের মূর্তি দেখতে। দিন বদলের হাওয়ায় এ গ্রামের মানুষের বিশ্বাসেও পরিবর্তন এসেছে। কেউ কেউ তাদের বাড়িতে দরজা লাগাচ্ছেন। তবে এখনো প্রায় সব মানুষই দরজা লাগানোর বিপক্ষে। তবে চাইলেই দরজা লাগানো সম্ভব হয় না, এজন্য নিতে হয় পঞ্চায়েতের অনুমতি।

আপনার মোবাইলে বা কম্পিউটারে The News বাংলা পড়তে লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন