মমতার সঙ্গী হয়ে টাটাকে তাড়িয়ে, এখন চরম ভুলের মাসুল দিচ্ছে সিঙ্গুরবাসী

1494
মমতার সঙ্গী হয়ে টাটাকে তাড়িয়ে, এখন চরম ভুলের মাসুল দিচ্ছে সিঙ্গুরবাসী/The News বাংলা
মমতার সঙ্গী হয়ে টাটাকে তাড়িয়ে, এখন চরম ভুলের মাসুল দিচ্ছে সিঙ্গুরবাসী/The News বাংলা

আধুনিক যুগের কালিদাস। নিজের পায়ে নিজেই মেরেছে কুড়ুল। হাঁ, বাংলা এই প্রবাদগুলো একেবারে মিলে যায় সিঙ্গুরবাসীর ক্ষেত্রে। সিঙ্গুরে ৯৯৭ একর জমির মধ্যে; এবার মাত্র ২৬০ একর জমিতে চাষ হয়েছে। সার, বীজ ও অনুদান দেওয়ার পরেও; সেখানে কৃষকরা চাষ করতে চাইছেন না; কারণ চাষ আর ভালো হচ্ছে না। মমতার সঙ্গী হয়ে টাটাকে তাড়িয়ে; আজ চরম ভুলের মাসুল দিচ্ছে সিঙ্গুরবাসি। এগার বছর আগে বাম সরকারের একটা সিদ্ধান্তে; শান্ত সিঙ্গুর বদলে গিয়েছিল আন্দোলনের অগ্নিভূমিতে।

এক দশকের লড়াইয়ের পর সেই মাটিই লিখে দিয়েছিল; কৃষক বিদ্রোহের অন্য আখ্যান। যাঁর নেতৃত্বে ছিলেন এক অগ্নিকন্যা। কারখানা হবে। একলাখি গাড়ি কারখানা। বহুফসলি জমিতেই হবে। সঙ্গে আছে ব্রিটিশ আমলের কৃষক-বিরোধী জমি অধিগ্রহণ আইন; আর বিধানসভা ভোটে বিপুল জয়ের আত্মবিশ্বাস।

আরও পড়ুনঃ মমতা সরষে বিজ ছড়ালেও সিঙ্গুরে ঘাসফুল ছাড়া কিছু হয় নি, কেন বললেন লকেট

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ভরসায় দু-হাজার ছয়ের মে মাসে; সিঙ্গুরে ন্যানো কারখানা তৈরির কথা ঘোষণা করে টাটা। ২০০৭-এর গোড়ায়; কারখানা তৈরির কাজ শুরু করল টাটা। আর তারপরেই শুরু মমতা ও সিঙ্গুরবাসীর আন্দোলন। টাটা কোম্পানির ছোট্ট ন্যানো গাড়ির কারখানা স্থাপন করতে; জমি অধিগ্রহণ করা নিয়ে তুমুল কেলেঙ্কারি বাঁধে বছর ১১ আগে।

বাম সরকার রাজ্যের ধুঁকতে থাকা শিল্পায়নকে চাঙ্গা করতে; এই কারখানাটি বসানোর পরিকল্পনা করলেও, তার বাস্তবায়নে দেখা দেয় রাজনৈতিক-সামাজিক সমস্যা। সিঙ্গুরের অনিচ্ছুক কৃষকরা জানিয়ে দিলেন; গায়ের জোরে বহুফসলি জমি অধিগ্রহণ তাঁরা মানবেন না। শুরু হল আন্দোলন। প্রতিবাদের মন বুঝতে দেরি করেননি; মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাশে দাঁড়ালেন অনিচ্ছুক কৃষকদের।

শুরু হল আন্দোলন। পিঠে হাড় গুঁড়িয়ে দেওয়া পুলিশের লাঠির বাড়ি। চোখে ধাঁধাঁ লাগিয়ে দেওয়া কাঁদানে গ্যাস। জমি না দিতে চাওয়া মানুষগুলোকে; জমিতে ফেলে বেধড়ক পেটাই। তাপসী মালিক, রাজকুমার ভুলের মৃত্যু। সিঙ্গুরের লড়াইয়ের বার্তা কলকাতা-সহ; গোটা দেশ, বিশ্বের কাছে পৌছে দিলেন মমতা। সিঙ্গুরের বিডিও অফিস থেকে তাঁকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে দিল প্রশাসন। ফিরে এসে মেয়ো রোডে অবস্থানে বসলেন তিনি। আড়াই মাস পর জোর করে জমি নেওয়ার প্রতিবাদে; ধর্মতলায় তাঁর ২৬ দিনের অনশন সিঙ্গুরের আন্দোলনে এঁকে দিল ল্যান্ডমার্ক।

আরও পড়ুনঃ রাজ্য কোষাগার শূন্য, নেই ডি এ, নতুন পে স্কেল, ৩৪ হাজার নতুন চাকরির ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী মমতার

আদালতের লড়াইয়ে, কলকাতা হাইকোর্ট রায় দিল, সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণে ভুল করেনি বাম সরকার। এরপরেই সিঙ্গুরের সানাপাড়ায় ধর্নায় বসলেন মমতা। ১৫ দিনের ধর্নায় অবরুদ্ধ দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে। কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হল টাটারা। রাজভবনে তত্‍কালীন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধীর মধ্যস্থতায়; বুদ্ধদেব-মমতা মুখোমুখি হলেও ভেস্তে গেল আলোচনা।

সিঙ্গুরে প্রতিবাদের দিনগুলোতে মমতা ‘উর্বর জমি’ এবং ‘অনিচ্ছুক চাষি’কে বাঁচানোর নামে; নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্যপূরণের জন্যে জান লড়িয়ে দেন। বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা; তার প্রবল জনভিত্তি এবং অন্যদিকে, বামেদের বিরুদ্ধে তিন দশকের প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া; ব্যর্থ হতে দেয়নি নেত্রীর মিশন। টাটারা সিঙ্গুর ছাড়ে ২০০৮ এর অক্টোবরে; বুদ্ধবাবু ক্ষমতাচ্যুত হন ২০১১ এর মে মাসে। তারপর থেকে বঙ্গ রাজনীতি শুধুই মমতাময়।

প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েই; মমতা জানিয়ে দেন জমি ফেরাবেই তাঁর সরকার। জমি ফেরাতে দুহাজার এগারোর জুনে; বিধানসভায় পাশ হল সিঙ্গুর জমি পুনর্বাসন ও উন্নয়ন বিল। টাটারা কলকাতা হাইকোর্টে গেলে; সিঙ্গল বেঞ্চ রায় দেয় সিঙ্গুর আইন বৈধ। সিঙ্গল বেঞ্চের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে; ডিভিশন বেঞ্চে যায় টাটা মোটর্স। দুহাজার বারোর জুনে; হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ সিঙ্গুর আইন অবৈধ বলে রায় দেয়।

জমি ফেরাতে সুপ্রিম কোর্টে যায় রাজ্য সরকার। সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণ অবৈধ। অধিগৃহীত সব জমিই কৃষকদের ফিরিয়ে দিতে হবে। এরপর সবুজ আবির, মিষ্টি মুখ। দুর্গতিনাশিনীর পুজোর আগেই যেন দুর্গতিনাশ হল সিঙ্গুরে। সিঙ্গুরের সানাপাড়ায় জোর করে জমি নেওয়ার প্রতিবাদে ধর্নায় বসেছিলেন মমতা। সেই একই জায়গায় এবার তিনি; সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মাথায় নিয়ে ফিরিয়ে দিলেন কৃষকের জমি। এত বছর ধরে যাঁরা ক্ষতিপূরণ নেননি; তাঁদের হাতে তুলে দিলেন চেক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে লেখা হল; কৃষক বিদ্রোহের নতুন গল্প। একটা আন্দোলনের নাম হয়ে গেল সিঙ্গুর।

কিন্তু কংক্রিটের কারখানা ভেঙে; আবার সেই জমিতে চাষ চালু করার প্রায় অসম্ভব এবং অবিশ্বাস্য এই প্রকল্পটিকে; বাস্তবায়িত করার জন্যে দিনরাত ঘাম ঝরিয়ে চলেছেন কিছু কৃষক; অথচ তারা জানেন যে কতটা দুরূহ এই কাজ। ইট-পাথর-কংক্রিটের টুকরো বোঝাই সেই জমিতে; আগের মতো ফসল ফলানোর বুলি আওড়ানো রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে তুড়ি বাজানোর মতো সহজ হতে পারে; কিন্তু যিনি জমিকে কাছ থেকে দেখছেন; তিনি জানেন, তা মৃত সন্তানকে জীবিত করে তোলার প্রয়াস ছাড়া আর কিছু নয়। আর সেটাই বাস্তব হয়েছে।

সিঙ্গুরের সঙ্কট শুধুমাত্র জমি বা ফসলেই সীমাবদ্ধ নয়। বলতে গেলে, সিঙ্গুরে হওয়া এই বিরাট রাজনৈতিক অপদার্থতা; টালমাটাল করে দিয়েছে সেখানকার অর্থনৈতিক এবং সমাজজীবনকে। মমতা সরকার চাষী পরিবারগুলোর জন্যে সস্তায় চাল এবং হাজারখানেক টাকার বন্দোবস্ত করেছে; কিন্তু তা তো কোন সমাধান নয়; বরং একটি জনপ্রিয়তাবাদকে ভাসিয়ে রাখতে; আরেকটি জনপ্রিয়তাবাদ।

সিঙ্গুরের বর্তমান অবস্থাকে সম্পূর্ণ নিরাময় করতে; যে দীর্ঘমেয়াদি এবং গভীর অর্থনৈতিক পরিকল্পনার আশু প্রয়োজন; তার ছিটেফোঁটাও পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বা সামাজিক নেতৃত্বের কাজে দেখা যায় না। প্রথমে বাম সরকারের অপদার্থতা এবং পরে তৎকালীন বিরোধীদের ধ্বংসের রাজনীতির ফলে; যে সিঙ্গুরের আজ সারা দেশের সামনে মডেল ভিলেজ হয়ে ওঠার কথা ছিল; তা আজকে আরও দরিদ্র, আরও অন্ধকার।

কিন্তু রাজনৈতিক অভিসন্ধি পূরণের এই খেলায়; জীবনের চলার পাথেয় হারিয়ে ফেললেন অনেক মানুষ এবং তাদের পরিবার। তার হিসাব কে দেবে? না থাকল চাষযোগ্য জমি; না হলো কারখানা; সিঙ্গুরের ভবিষ্যৎ আজ এক অজানা আঁধারের সম্মুখীন। বৃদ্ধ-জোয়ান-নারী-পুরুষ সবারই আজ এক প্রশ্ন; ভবিষ্যৎ কী? সিঙ্গুরের চাষীর ভালো করছি ভেবে আসলে যে সর্বনাশটি; রাজনীতিবিদরা করে ফেলেছে, তাতে পূর্ণ সমর্থন ছিল এই সিঙ্গুরবাসীরই। স্বার্থপর রাজনীতি, সমাজনীতির কারণে রাজনীতিবিদের ‘মহান হওয়ার দায়টি’ চুকে গিয়েছে। এখন সিঙ্গুরবাসী ওদের নিজেদের সমস্যা বুঝে নিক!

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সিঙ্গুরে শেষমেশ কে শেষ হাসি হাসল? যার জন্যে লড়ছি বলে ‘দেশনেতারা’ এত তর্জনগর্জন করলেন; ‘ঐতিহাসিক জয়’ বলে আস্ফালন করলেন; সেই সাধারণ মানুষের আদতে কতটা উপকারে এল এই ‘জয়’? সিঙ্গুরে ৯৯৭ একর জমির মধ্যে; এবার মাত্র ২৬০ একর জমিতে চাষ হওয়াটাই প্রমাণ করে; কি ভুলটাই না করেছে তাঁরা। নিজের পায়ে কুড়ুল মারলে; তার মাসুল তো দিতেই হবে; নিজেদের জীবন দিয়ে তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে সিঙ্গুরবাসী।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন