মন্দিরে সুভাষ ধর্মে সীতারাম সিপিএম, ইসরোর বিজ্ঞানীকে সমালোচনা করে দ্বিমুখী নীতিতেই শেষ বাম

1095
মন্দিরে সুভাষ ধর্মে সীতারাম সিপিএম, তবু ইসরোর মহাকাশ বিজ্ঞানীকে নিয়ে দ্বিমুখী নীতিতে বাম/The News বাংলা
মন্দিরে সুভাষ ধর্মে সীতারাম সিপিএম, তবু ইসরোর মহাকাশ বিজ্ঞানীকে নিয়ে দ্বিমুখী নীতিতে বাম/The News বাংলা

মানব গুহঃ তারাপীঠে মন্দিরে গিয়ে পুজো দিতে পারেন; বাম নেতা সুভাষ চক্রবর্তী। হায়দ্রাবাদে মহাকালীর মন্ত্রপূত ফুলের পাত্র; মাথায় তুলে ধর্মপালন করতে পারেন বামনেতা সীতারাম ইয়েচুরি। কিন্তু চন্দ্রযান ২ লঞ্চের আগে; ইসরোর মহাকাশ বিজ্ঞানী ও চীফ কে শিভন মন্দিরে গিয়ে পুজো দিলেই সমস্যা। মন্দিরে সুভাষ ধর্মে সীতারাম ও সিপিএম; অন্যদিকে ইসরোর বিজ্ঞানীকে সমালোচনা; আর এই দ্বিমুখী নীতিতেই দেশ ও রাজ্য থেকে শেষ হচ্ছে বাম।

দৃশ্য ১; প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর; একটি গুরুদ্বারে গিয়েছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ও বিখ্যাত বাম নেতা জ্যোতি বসু। গুরুদ্বারে গিয়ে মাথায় কাপড় দিয়ে; সব রীতি-নীতি মেনে প্রার্থনা করেছিলেন তিনি। কেউ প্রশ্ন করেননি; কেন ধর্মস্থলে জ্যোতি বসু? প্রশ্ন করার আর সমালোচনা করার একচেটিয়া অধিকার; শিক্ষিত বলে দাবী করা বামেদের?

আরও পড়ুনঃ সর্বহারা চাষির ছেলের হাতে ভারতের চাঁদে নামার স্বপ্ন, মন্দির যাওয়া ও কান্না নিয়েই ব্যস্ত বাম

দৃশ্য ২; হিন্দুদের বোনালি উৎসব চলছিল হায়দ্রাবাদে। হিন্দুদের এই উৎসবে সামিল হন; সিপিএম সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি। মাথায় মহাকালীর মন্ত্রপূত ফুলের পাত্র নিয়ে ছবিও ভাইরাল হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। তবে এটা কোন অজানা কারণে ধর্মপালন নয়। এটা শুধুই জনসংযোগ!

দৃশ্য ৩; সস্ত্রীক তারাপীঠে মন্দিরে গিয়ে পুজো দেন; বাম নেতা সুভাষ চক্রবর্তী। শুরু হয় হইচই। দলের মধ্যেই ওঠে; কঠোর সমালোচনার ঝড়। তবে টলানো যায়নি সুভাষ চক্রবর্তীকে। বলেছিলেন; “কমিউনিস্ট হয়ে ধর্মপালন করা যাবে না; কোথাও লেখা নেই”।

দৃশ্য ৪; খালি গায়ে চাদর; ধুতি পরা প্রাক্তন সিপিএম সাংসদ ঋতব্রতর; কেরলের গুরুভায়ুরে শ্রীগুরুভায়োরপ্পন মন্দিরের সামনে দাঁড়ানো ছবি; ভাইরাল হয়। তাঁর ওই মন্দিরে যাওয়া নিয়ে; পক্ষে ও বিপক্ষ মন্তব্য ভরে ওঠে সোশ্যাল মিডিয়া। ওই ছবিতে ছিলেন তৎকালীন সমাজবাদী পার্টির সাংসদ; রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী কিরণময় নন্দও।

আরও পড়ুনঃ হাতে জ্যোতিষের আংটি ও তাগা পরে, মানুষের মন্দিরে যাবার সমালোচনা করে বামেদের দ্বিচারিতা

দৃশ্য ৫; বাম নেতা ও সিপিএমের এক সময়ের সাধারণ সম্পাদক হরকিষণ সিং সুরজিত্‍; ধর্মীয় আচার মেনে পাগড়ি পরতেন। দাড়িও রাখতেন। বহুবার এই নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। তবু শেষ দিন পর্যন্ত এই বেশই ছিল সুরজিতের। নিজের ধর্মপালনে কোনদিন ইতস্তত করেননি; এই মহান নেতা।

দৃশ্য ৬; সপরিবারে হজ যাত্রা করেছেন; প্রাক্তন সিপিএম নেতা রেজ্জাক মোল্লা। ধর্ম পালন করে হয়েছেন হাজি। সমালোচনা হয়নি। কারণ এক; তিনি মুসলিম ধর্ম্যালম্বি; ও তার চেয়েও বড় তিনি সেই সময় কমিউনিস্ট ছিলেন। কমিউনিস্টদের সমালোচনা হয় না; তাঁরা সমালোচনা করেন শুধু। তবু কথা ওঠার পর; “সিপিএম করলে কেন ধর্মাচারণ করা যাবে না; তা নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন তোলেন রেজ্জাক মোল্লা।

দৃশ্য ৭ এবং ৮; উত্তর দমদমের বিধায়ক তন্ময় ভট্টাচার্য; ও বিধানসভার বাম পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী। সুজনই প্রথম ওজনদার সিপিএম নেতা; যিনি কমিউনিস্ট সুলভ ছুতমার্গ ভেঙে; দুর্গাপুজো ও কালীপুজোর উদ্বোধনে হাজির হচ্ছেন। তবে বামেদের এই পথ দেখিয়েছেন; বাম বিধায়ক তন্ময় ভট্টাচার্য। গুরু সুভাষ চক্রবর্তীর দেখানো পথে; হাঁটছেন তন্ময়। কালীপুজোর উদ্বোধনে হাজির হয়েছিলেন, হচ্ছেন হবেনও৷

আরও পড়ুনঃ কালাম কেন মসজিদে, শিভন কেন মন্দিরে, বিজ্ঞানীদের ধর্মস্থলে যাওয়া নিয়ে বুদ্ধিজীবীদের প্রশ্ন

কালীমূর্তির সামনে তন্ময়ের দাঁড়িয়ে থাকার ছবি ঘিরে; সোশ্যাল মিডিয়ায় হইচই পড়ে যায়৷ সিপিএমের নীতিবাগিশ নেতারা; তন্ময়কে খোঁচা দিতে বিলম্ব করেননি৷ যদিও তন্ময় তাতে দমে না গিয়ে; সমালোচকদের জবাব দিয়েছিলেন। এবারও নিজের বিধানসভা এলাকায় বিভিন্ন দুর্গা পুজো ও কালীপুজোর মণ্ডপে হাজির থাকার পরিকল্পনা রয়েছে তন্ময়ের৷ তন্ময়ের দেখানো রাস্তায় হেঁটেই; সুজনও কালীপুজোর উদ্বোধনে হাজির হওয়ায় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন; আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের অনুমতি ছাড়াই।

অবশ্য, দেশের রাজনীতিতে যেভাবে ধর্মকে তুলে আনা হচ্ছে; সেখানে হালে পানি পেতে মরিয়া সিপিএম। বিগত প্লেনাম-গুলিতেও এই বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ভোটের অঙ্ককে সামনে রেখে দলের অন্দরেও; বিস্তারিত কাটাছেঁড়ে হয়েছে। নেতারা বলার চেষ্টা করেছেন; স্টলে বসে মার্কসবাদের তত্ত্বকথা প্রচার না করে; সরাসরি ধর্মীয় উৎসবে-অনুষ্ঠানে যুক্ত হওয়া। তাতে জনসংযোগ বাড়বে। দল পৌছবে সাধারণের কাছে। কিন্তু কট্টরপন্থী বাম কর্মীদের মধ্যে; এখনও ছুঁতমার্গ থেকেই যাচ্ছে।

এতকিছুর পরেও; তবু ইসরোর মহাকাশ বিজ্ঞানীকে নিয়ে দ্বিমুখী নীতিতে বাম। বিজ্ঞানীরা কেন মন্দিরে যাবেন? বিজ্ঞানীরা কেন ধর্মস্থানে প্রার্থনা করতে যাবেন? ল্যাণ্ডার বিক্রম এর সঙ্গে; ইসরোর বিজ্ঞানীদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ও ফের ছবি দেখতে পাওয়ার; মধ্যেই দেশ জুড়ে আরও একটি বিতর্ক মাথা চাড়া দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের কি মন্দিরে যাওয়া উচিত? কেন কুসংস্কারের রাস্তায় বিজ্ঞানীরা? প্রশ্ন ‘তথাকথিত’ শিক্ষিত বামেদের। আর এই দ্বিমুখী নীতিতেই শেষ হচ্ছে বাম; মত রাজনৈতিক মহল থেকে রাজনীতি-প্রিয় সাধারণ মানুষের।

সস্ত্রীক তারাপীঠে মা তারার পুজো দিয়ে; ‘জয় মা তারা’ জয়ধ্বনি করে সিপিএমে সমালোচনার মুখে পরেছিলেন সুভাষ চক্রবর্তী। মাথায় কাপড় ঢেকে নিয়ম মেনে গুরুদ্বারে ঢোকা; জ্যোতি বসু বলেছিলেন; “সুভাষ পাগল হয়ে গেছে”। সুভাষ চক্রবর্তী নিজের গুরু জ্যোতি বসু ও বাম নেতাদের বলেছিলেন; “মন্দিরে দেবতা থাকেন না। থাকে মানুষ। আর মানুষের আবেগ-কে গুরুত্ব না দিলে কমিউনিস্ট হওয়া যায় না!”। বাংলার বাম নেতারা যত তাড়াতাড়ি এটা মানতে পারেন; ততই মঙ্গল। না হলে কংগ্রেসের মত খুব শীঘ্রই; শুধুই ভোটের পাতায় থেকে যাবে বাংলার বামেরা।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন