পরাধীন ভারতে লোহার শিকলে গঙ্গা ঘিরে, ইংরেজদের জাহাজ চলা বন্ধ করেছিলেন রানী রাসমণি

1691
পরাধীন ভারতে লোহার শিকলে গঙ্গা ঘিরে, ইংরেজদের জাহাজ চলা বন্ধ করেছিলেন রানী রাসমণি
পরাধীন ভারতে লোহার শিকলে গঙ্গা ঘিরে, ইংরেজদের জাহাজ চলা বন্ধ করেছিলেন রানী রাসমণি

পরাধীন ভারতে লোহার শিকলে গঙ্গা ঘিরে; ইংরেজদের জাহাজ চলা বন্ধ করেছিলেন রানী রাসমণি। তখন কলকাতাকে ঘিরে ছিল, অনেকগুলো গাঙ্গেয় অববাহিকা; হ্রদ, উপহ্রদ সহ অনেক জলাশয়। কলকাতা-বাসীদের বিশাল একটা অংশের; জীবিকার উৎস ছিল মাছ ধরা। ভারতীয় উপমহাদেশে তখন; ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্ব। কোম্পানির চোখের সামনে দেশীয়দের; ‘মৎস্য মারিবো খাইবো সুখে’; ব্যাপারটি সহ্য হচ্ছিল না। তাই মাছ ধরার উপর; কর আরোপ করা হল। যথারীতি যেসব জেলেরা কর দিতে অসম্মতি জানায়; তাদেরকে পেয়াদা পাঠিয়ে নির্যাতন করত ব্রিটিশ প্রশাসন। অসহায় জেলেদের জীবিকার অবলম্বন; জালটাও ছিঁড়ে ফেলা হত। বসে বসে মার না খেয়ে; জেলেরা গেলেন রানী রাসমণির কাছে। রানী তাদের সান্ত্বনা দিলেন; এবং ব্যাপারটা দেখছেন বলে আশ্বস্ত করলেন।

রানী জানতেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগ করে; জেতা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। এগোতে হবে ভিন্ন রাস্তায়; অবলম্বন করতে হবে ভিন্ন কৌশল। সেটা হলো ব্যবসায়িক চাল; কিংবা বুদ্ধির মারপ্যাঁচ। রানী কোম্পানির কাছ থেকে, গঙ্গা থেকে ঘুসুড়ি হয়ে মেটিয়াবুরুজ পর্যন্ত; ৫ কিলোমিটার এলাকা ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে ইজারা নেন। যেই ইজারার দলিল এবং কাগজপত্র, রানীর হাতে এসে পৌঁছাল; সেই তিনি জেলেদের এক অভিনব হুকুম দিলেন। রানীর হুকুমে রাতারাতি লোহার মোটা মোটা শিকল দিয়ে; ইজারা নেওয়া গঙ্গার অংশটুকু ঘিরে ফেলা হল।

আরও পড়ুনঃ ইতিহাসে পড়ানো হয় না, আফগানদের পরাজিত করে ভারত ভূমি রক্ষা করেছিলেন নাগা সন্ন্যাসীরা

জেলেদের শুধুমাত্র ঘেরাওকৃত স্থানে; মাছ ধরতে বলা হল। ফলে পুরো এলাকার ঘাটগুলোতে; সব ধরনের নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। কোম্পানির বড় বড় পণ্যবাহী জাহাজগুলো; আটকে গেল রানীর লোহার শিকলে। কলকাতার এক রানী কিনা; ব্রিটিশরাজের সঙ্গে টক্কর দিচ্ছে! এ খবর বারুদের বেগে ছড়িয়ে পড়ল; সারা শহরে, তারপর গোটা দেশে। এহেন কাণ্ড এর আগে; কলকাতাবাসী দেখেনি কখনো। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে, প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও ছুটে এলেন; অভিনব সেই দৃশ্য দেখার জন্য।

আরও পড়ুনঃ কলকাতাকে লন্ডন বানানোর রসিকতা ছাড়ুন, ক্যালকাটা-লন্ডন বাস পরিষেবা ছিল বিশ্বের বিস্ময়

যথারীতি রানীকে সর্বোচ্চ আদালতে তলব করা হল; এবং সেই সঙ্গে লোহার শিকলের বাঁধন অবিলম্বে খুলে দিতে আদেশ করা হল। কিন্তু রানী তা করতে; অসম্মতি জানালেন। কারণ হিসেবে বললেন, তিনি ব্রিটিশরাজ থেকে; ঐ এলাকাটুকু ইজারা নিয়েছেন। নিজের ব্যবসায়িক ও প্রজার স্বার্থে; তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। তাছাড়া কোম্পানির জাহাজ চলাচলের কারণে, জেলেদের জাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়; এবং মাছেরা এই এলাকায় আসে না। এতে প্রজার ক্ষতি; এবং রানীর ব্যবসায়িক ক্ষতি। তাছাড়া এমন কাজ তিনি ইচ্ছা করে করেননি; বরং কোম্পানি তাকে বাধ্য করেছে। এই বাঁধ তিনি তখনই ওঠাবেন; যখন তার প্রজাদের উপর আরোপ করা কর উঠিয়ে নেওয়া হবে।

রানীর বুদ্ধিমত্তা এবং যুক্তির কাছে; কোম্পানি মাথা নত করল। জেলেদের উপর সকল প্রকার কর; উঠিয়ে নেওয়া হল। এবং রানীকে ইজারা বাবদ ১০ হাজার টাকা; ফেরত দেওয়া হল। তখন থেকে আজ পর্যন্ত, কলকাতা ও বাংলার কোন অঞ্চলেই; গঙ্গায় মাছ ধরার উপর কোন কর নেই। রানীর সাহসিকতার নিদর্শনস্বরূপ উত্তর কলকাতার নিমতলা ঘাটের, আদি ভূতনাথ মন্দিরের কাছাকাছি; এখনও সেই বিশাল লোহার পিলার ও কিছু লোহার শিকল আছে। রানী রাসমণির লোহার শিকলে গঙ্গা ঘেরার গল্প; আজও মানুষের মুখে মুখে ঘোরে।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন