৭ বছরের চুরি ৭ সেকেন্ডে মাটিতে, গড়তে ভাঙতে ২০০ কোটি জলে, মানুষের হাতে রইল ‘গোল্লা’

9792
৭ বছরের চুরি ৭ সেকেন্ডে মাটিতে, গড়তে ভাঙতে ২০০ কোটি জলে, মানুষের হাতে রইল 'গোল্লা'
৭ বছরের চুরি ৭ সেকেন্ডে মাটিতে, গড়তে ভাঙতে ২০০ কোটি জলে, মানুষের হাতে রইল 'গোল্লা'

৭ বছরের চুরি ৭ সেকেন্ডে মাটিতে; গড়তে ভাঙতে ২০০ কোটি জলে; মানুষের হাতে রইল ‘গোল্লা’। ২০১৬ সালের ৩১ মার্চ কলকাতার গিরিশ পার্কে; নির্মাণাধীন বিবেকানন্দ উড়ালপুল আচমকাই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছিল। ঘটনায় প্রাণ হারিয়ে‌ছিলেন ২৭ জন; আহত হয়েছিলেন শতাধিক। ধ্বংসস্তূপ ধীরে ধীরে সরিয়ে নেওয়া হলেও; পড়ে ছিল উড়ালপুলের নিশ্চল কাঠামো। শেষ পর্যন্ত, ১৫ জুন, ২০২১ তারিখে শুরু হয়; বিবেকানন্দ রোড উড়ালপুল ভাঙার প্রথম পর্যায়ের কাজ। গড়তে ভাঙতে খরচ হল প্রায় ২০০ কোটি; তবে মানুষের হাতে থাকবে একটা বড় গোল্লা বা শূন্য।

পোস্তার আশে পাশে বহু পুরনো বাড়ি থাকায়; মুম্বই থেকে বিশেষ যন্ত্র আনা হয়েছে। রোবোটিক ব্রেকার নামের ওই যন্ত্র দিয়ে; কাজ করলে কোনও কম্পন হয় না। তাই ক্ষতির সম্ভাবনাও; খুব কম। উড়ালপুল ভাঙার সময় বিশেষ কিছু সলিউশন; ব্যবহার করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। তাতে কিছু অংশ; ভাঙার প্রয়োজন হবে না। পোস্তা উড়ালপুল ভাঙার প্রথম অংশের কাজ সম্পন্ন হলে; শুরু হবে দ্বিতীয় অংশ ভাঙার কাজ। গিরিশ পার্ক থেকে থেকে গণেশ টকিজ পর্যন্ত; ভাঙা হবে দ্বিতীয় দফায়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ছ-মাসের মধ্যে; সেই কাজ সম্পূর্ণ হবে।

গোটা ফ্লাইওভার ভাঙতে মোট; ১৫.৭৫ কোটি টাকা খরচ হবে। তবে নতুন ফ্লাইওভার তৈরির সম্ভাবনা; একেবারেই ক্ষীণ বলেই সূত্রের খবর। ২.২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই উড়ালপুলের নির্মাণকাজ; শুরু হয়েছিল ২০০৯ সালে। উদ্দেশ্য ছিল কলকাতার সঙ্গে; হাওড়ার যোগাযোগ সহজতর করা। বেশ কয়েক বছরের টালবাহানার পর; ২০১৬ সালেও শেষ হয়নি নির্মাণকাজ। বলা হয়েছিল ২০১০ সালের মধ্যে; উড়ালপুলটির নির্মাণ সম্পূর্ণ হবে।

আরও পড়ুনঃ “রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার ক্ষমতা আমার হাতে”, মহিলা ইন্টার্নকে হুমকি দিয়ে ফের বিতর্কে তৃণমূলের নির্মল

সময় পেরিয়ে গেলেও সংস্থাটি; নির্মাণ সম্পূর্ণ করতে ব্যর্থ হয়। এরপর নতুন সরকারের মুখ্যমুন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময়, ২০১৩ সালে নতুন করে সংস্থাটিকে নির্মাণের বরাত দেওয়া হয়; ও নির্মাণ খরচ ১৬৫ কোটি টাকা স্থির করা হয় এবং ১৮ মাস সময় দেওয়া হয় নির্মাণ শেষ করার জন্য। তবে এবারও সংস্থাটি ব্যর্থ হয়; নির্মাণ শেষ করতে। এই সংস্থটি পূর্বেই উত্তর প্রদেশ ও ঝাড়খন্ড সরকার দ্বারা; কাল তালিকা ভূক্ত ছিল। তবে বাংলায় বাম ও তৃণমূল আমলে কোটি কোটি টাকার বরাত পেয়েছে।

৩০ শে মার্চ ২০১৬ সালে, পতনের এক দিন আগে; সেতুতে কংক্রিট স্থাপন করা হয়েছিল। পতনের মাত্র এক ঘণ্টা আগে, নির্মান শ্রমিকরা; সেতুর উপর স্থাপিত কংক্রিটের ক্রেকিং গোলমাল বা কংক্রিট ফাটার শব্দ শুনেতে পেয়েছিলেন। ১২.৩২ (দুপুর) এর সময় হঠাৎ করে বিবেকানন্দ উড়ালপুল এর ৪০ মিটার লম্বা ইস্পাতের গাডার বক্স সহ; সেতুটি ভেঙে পরে নিচের রবীন্দ্র সরনি ও কে.কে ঠাকুর রোডের সংযোগ স্থলে।

নির্মলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়; নকশার দুর্বলতাগুলির কারণে উড়ালপুলের পতন ঘটেছে। আইআইটি-কেজিপি-এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রাক্তন প্রধান আনন্দপ্রসন্ন গুপ্ত বলেন যে; উড়ালপুলের নির্মাণ, নকশা, নির্মাণের কাঁচামাল এবং তত্ত্বাবধান একাধিক ক্ষেত্রে; অসঙ্গতির কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে।

আরও পড়ুনঃ রাজ্যের করোনা বিধি ভেঙে, কালীঘাটে গর্ভগৃহে ঢুকে পুজো মন্ত্রী সুজিত বসুর

পোস্তার উড়ালপুল ভেঙে পড়ার পর, মুখ্যমন্ত্রী মমতার নির্দেশে; খড়গপুর আইআইটির তিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ও তৎকালীন মুখ্যসচিব বাসুদেব বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। নির্মীয়মাণ সংস্থা আইভিআরসিএলের বিরুদ্ধে, ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ নম্বর ধারায়; মামলা দায়ের করা হয়। উড়ালপুলের নকশা ত্রুটিপূর্ণ ছিল বলে; তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দেয়। সেইসঙ্গে উড়ালপুলের যে অংশ নির্মাণ হয়েছে; সেই অংশটিও ভেঙে ফেলার সুপারিশ দেয়।

“উড়ালপুলের শিলান্যাসের দিন ছিলাম; তারপর ৬-৭ বছর ধরে এই উড়ালপুল তৈরি হতে দেখলাম। ২০১৬ সালে ভেঙেও পড়ল; চোখের সামনে। এ বার এত দিনের এই বিশাল নির্মাণকে; ভাঙতে দেখব। একই উড়ালপুল তৈরি হতে; আর ভাঙতে কেউ দেখেছি কি”? প্রশ্ন করলেন জোঁড়াসাকো কালিবাড়ির সেবায়েত; কার্তিক ভট্টাচার্য। গড়তে ভাঙতে কোথায় মিলিয়ে গেল ২০০ কোটি টাকা; মানুষের হাতে তাহলে কি শুধুই পেন্সিল? প্রশ্ন বাংলার আমজনতার।

আগামী ৪৫ দিন ধরে চলবে; পোস্তা উড়ালপুল ভাঙার কাজ। এক এক করে কেটে; নীচে নামানো হবে বিভিন্ন অংশ। কিছু দিন পর; পোস্তা উড়ালপুল মিলিয়ে যাবে। থেকে যাবে পোস্তা উড়ালপুল; ভেঙে পড়ার স্মৃতি। আরও কয়েক বছর পর কোনও বৃষ্টির দিনে; গণেশ টকিজ দিয়ে যাওয়ার সময় গাড়ির মধ্যে থেকে; কেউ হয়তো তাঁর সন্তানকে একটা উড়ালপুলের গল্প শোনাবেন। মানুষের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে; পোস্তা উড়ালপুল। জানি না পোস্তা উড়ালপুলের স্মৃতিতে; কোনও ফলক থাকবে কি না! তবে মানুষের মনেও থাকবে না; ২০০ কোটি টাকা জলে গিয়েছে বিবেকানন্দ ব্রিজের জন্য।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন