উত্তমকুমার বনাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ল’ড়াইয়ে দু-ভাগ হয়েছিল বাংলা ফিল্ম জগৎ

1929
উত্তমকুমার বনাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ল'ড়াইয়ে দু-টুকরো হয়েছিল বাংলা ফিল্ম জগৎ
উত্তমকুমার বনাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ল'ড়াইয়ে দু-টুকরো হয়েছিল বাংলা ফিল্ম জগৎ

গল্প হলেও সত্যি! উত্তমকুমার বনাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ল’ড়াইয়ে; দু-ভাগ হয়েছিল বাংলা ফিল্ম জগৎ। ৬০-এর দশকের শেষ দিকে; উপযুক্ত পারিশ্রমিক পাচ্ছেন না বলে; ক্ষোভ দেখা গিয়েছিল সিনেমার নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত কলাকুশলীদেরও মধ্যে। যার ফলে বেশ কিছু দাবিতে; ধর্মঘটের ডাক দেয় ‘‌সিনে টেকনিশিয়ানস ওয়াকার্স ইউনিয়ন’‌। ১৯৬৮ সালে যখন এই ধর্মঘট শুরু হয়; তখন ‘‌অভিনেতৃ সঙ্ঘ’ সেই আন্দোলনকে; নৈতিক সমর্থন করে। তখন ‘অভিনেতৃ সঙ্ঘ’‌ এর সভাপতি ছিলেন; উত্তমকুমার এবং সম্পাদক ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এদিকে রাজ্যে যুক্তফ্রন্ট সরকার থাকায়; কর্মচারি ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলিরও তখন বেশ জ’ঙ্গি মনোভাব। সেই সময় আবার গঠিত হয়; ‘‌পশ্চিমবঙ্গ চলচ্চিত্র সংরক্ষণ সমিতি’‌। এবং এই সংগঠনে পুরোভাগে ছিলেন; উত্তমকুমারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন প্রযোজক। শুরু হয় লড়াই।

এই গোলমালের মধ্যেই তৈরি হল; ‘‌পশ্চিমবঙ্গ চলচ্চিত্র সংরক্ষণ সমিতি’‌। আসলে এটি বড় প্রযোজকদের ছত্রছায়ায় তৈরি সংগঠন; যার নেতৃত্বে ছিলেন অসিত চৌধুরী, দীপচাঁদ কাঙ্কারিয়ার মতো; উত্তমকুমারের ঘনিষ্ঠ প্রযোজকেরা। এই সমিতির সঙ্গে এই ধর্মঘটের; কোনো সরাসরি যোগ ছিল না। কিন্তু কর্মী–কর্মচারীদের সন্দেহ ছিলই; এটি হচ্ছে আসলে প্রযোজকদের স্বার্থ দেখবার এক ‘‌কভার–আপ–ফোরাম’‌। ফলে গোড়ার দিকে হল কর্মীদের এই আন্দোলনে; সমর্থন ছিল সমিতি তথা অভিনেতৃ সঙ্ঘের।

আরও পড়ুনঃ শেষ ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি, না ফেরার দেশে অপু

এই সময় অভিনেতৃ সঙ্ঘের একাংশ; সঙ্ঘের তহবিল থেকে দশ হাজার টাকা ধর্মঘটীদের দিতে চায়। কিন্তু তা নিয়ে মতভেদ দেখা দেয় ৷ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুপকুমাররা ছিলেন; টাকা দেওয়ার পক্ষে। কিন্তু বিকাশ রায়, জহর গাঙ্গুলীরা তার বিরোধিতা করেন। এদিকে উত্তমকুমার প্রযোজকদের প্রতিনিধি হয়ে পড়েছেন; বলে তখন অভিযোগ ওঠে। তা নিয়ে পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয় যে; উত্তমকুমার নিজেই, সৌমিত্র এবং ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর ক্ষুব্ধ হন। ফলে পরিস্থিতি এমনই পর্যায়ে পৌঁছায় যে; সদস্যেদের মধ্যে ভোটাভুটি করতে হয়। আর সেই ভোটে জিতে; অভিনেতৃ সঙ্ঘের সভাপতি হন সৌমিত্র।

আরও পড়ুনঃ দীপাবলির আগের রাতেই আলো নিভে গিয়েছে, ভাইফোঁটার আগে ফিরছে শ’হিদ সুবোধ ঘোষ

এরপর যথারীতি সঙ্ঘ ধর্মঘটীদের ১০,০০০টাকা দেয়। অন্যদিকে উত্তমকুমার ক্ষুব্ধ হয়ে সঙ্ঘ ছেড়ে এসে; তৈরি করেন শিল্পী সংসদ। উত্তমের সঙ্গে শিল্পী সংসদে; তখন বিকাশ রায় জহর রায়েরা। অন্যদিকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়েরা; অভিনেতৃ সংঘে। আপাতদৃষ্টিতে মনে করা হয়ে থাকে; বামপন্থীরা তখন ‘‌অভিনেতৃ সঙ্ঘ’‌ এ; এবং কংগ্রেসী সমর্থকরা যোগ দিয়েছেন ‘‌শিল্পী সংসদ’‌ এ। তবে অতটা সরল বিভাজন তখন সেটা ছিল না; কারণ বিপরীত মতাদর্শের লোক হলেও অনিল চট্টোপাধ্যায়, নির্মল ঘোষেরা কিন্তু শিল্পী সংসদে যোগ দেন। মতাদর্শের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সংঘাতও; সেই সময় কাজ করেছিল সংগঠন দুটির ক্ষেত্রে; বলে মনে করেন অনেকে।

তবে এটাও ঘটনা এর কিছু দিন বাদে; বসুশ্রী সিনেমা হলে এক অনুষ্ঠানে মঞ্চে; অন্যান্য শিল্পীদের সঙ্গে হাজির ছিলেন উত্তম, সৌমিত্র এবং ভানু। সেখানে সৌমিত্র, ভানুকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেও; উত্তমকুমারকে হাতজোড় করে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। তখন উত্তমকুমার সৌমিত্রের কাছে জানতে চান; এতদিন সৌমিত্র, উত্তমকে বড় ভাইয়ের মতো ভেবে; পায়ে হাত দিয়ে তাকে প্রণাম করে এসেছেন। কিন্তু এখন তাদের সংগঠন আলাদা বলেই কি; এমন আচরণ করা হল? তখন অবশ্য সৌমিত্র সঙ্গে সঙ্গে, পায়ে হাত দিতে প্রণাম করে; ক্ষমা চেয়ে নিলে উত্তমও তাঁকে জড়িয়ে ধরেন। আর দুজনের সম্পর্কের বরফ গলে; আবার আগের মতো হয়ে যায়।

Please follow and like us:
error

আপনাদের মতামত জানাতে কমেন্ট করুন